চুয়াডাঙ্গার জীবননগর পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জামান ডাবলু (৪৮) সেনাবাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন বলে জানা গেছে। সোমবার (১২ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।এ ঘটনা জানাজানি হলে বিক্ষুদ্ধ বিএনপির নেতাকর্মীরা চুয়াডাঙ্গা-যশোহর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) সকালে মরদেহ মর্গে নিতে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন, পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলামসহ অতিরিক্ত সেনা সদস্যারা জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবস্থান নেন। এ সময় বিএনপির নেতাকর্মীরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বাইরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন।পরে দুপুর দেড়টার দিকে কঠোর প্রশাসনিক নিরাপত্তায় মরদেহের পোস্টমর্টেম করতে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল মর্গে নেওয়া হয়।এদিকে মঙ্গলবার বেলা ১১ টার দিকে চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু ও সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান শরীফ ঘটনাস্থলে আসেন। এ সময় বাবু খান সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ঘটনার সঠিক তদন্ত করে বিচারের দাবি করেন।তিনি বলেন, ‘আপনারা কেউ আইন হাতে তুলে নিবেন না। এ ঘটনার বিচার হবে।’ এ সময় তিনি বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীদের শান্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চেষ্টা করেন।এরপর চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রবেশ করেন। দুপুর দেড়টায় মরদেহ উদ্ধার করে এম্বুল্যান্সযোগে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়।পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এই মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। এ ঘটনায মামলা হবে। পুলিশবাহিনীর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ আইনী সহযোগিতা দেওয়া হবে।’জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন বলেন, ‘সুরতহাল রিপোর্ট আমি পেয়েছি। এখন আমি লাশ নিতে এসেছি। ময়লাতন্ত হবে। সঠিক বিচারের দায়িত্ব আমি নেব।’নিহত বিএনপি নেতা শামসুজ্জামান ডাাবলুর সহধর্মিণী জেসমিন আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামী ফার্মেসি বন্ধ করে বাড়িতে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ সময় আর্মিরা এসে তাকে বেদম মারধর করে। তারপর অসুস্থ হয়ে গেলে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে মারা যায়।’জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও প প কর্মকর্তা ডাঃ মকবুল হোসেন বলেন, ‘সুরতহালে মরদেহের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।’পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাত আনুমানিক ৯টা ১৫ মিনিটের দিকে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে অবস্থিত শামসুজ্জামান ডাবলুর ফার্মেসি থেকে তাকে তুলে নিয়ে যায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৬ এডি রেজিমেন্ট (টিটিসি আর্মি ক্যাম্প) এর একদল সদস্য।অভিযোগ উঠেছে, অস্ত্র উদ্ধার অভিযানের কথা বলে তাকে জীবননগর উপজেলা বিএনপি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ চলাকালীন তার ওপর নির্যাতন চালানো হয় বলে দাবি করেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা।নির্যাতনের এক পর্যায়ে ডাবলু গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে রাত ১০টার পর সেনাসদস্যরা তাকে জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসেন। এ সময় হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা ও শোকের ছায়া নেমে আসে।নিহত শামসুজ্জামান ডাবলু দুই সন্তানের পিতা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার দুই শিশুপুত্রের সাথে ডাবলুর একটি ছবি ছড়িয়ে পড়লে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন সাধারণ মানুষ ও দলীয় কর্মীরা।জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে এবং একে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করা হয়েছে।এই ঘটনায বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘গত ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখ আনুমানিক রাত ১১টায় চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলায় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে যৌথ বাহিনী কর্তৃক একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানকালে, জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন একটি ফার্মেসি থেকে অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে মোঃ শামসুজ্জামান ওরফে ডাবলুকে (৫০) আটক করা হয়।’‘পরবর্তীতে, আটককৃত ব্যক্তির প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে টহল দল উক্ত ফার্মেসিতে তল্লাশি পরিচালনা করে ১ টি ৯ মি. মি. পিস্তল, ১ টি ম্যাগাজিন ও ৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। অভিযান শেষে আটককৃত ব্যক্তি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অচেতন হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে, আনুমানিক রাত ১২টা ২৫ মিনিটে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক ও কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘ইতোমধ্যে উক্ত ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডার ও অভিযানে অংশগ্রহণকারী সব সেনা সদস্যদের সেনানিবাসে প্রত্যাহার এবং সঠিক কারণ উদঘাটনের উদ্দেশ্যে একটি উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সেনা আইন অনুযায়ী যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ইখা
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
