চট্টগ্রাম নগরীতে উদ্ঘাটিত হয়েছে এক ভয়ংকর ও পরিকল্পিত কর–জালিয়াতির কেলেঙ্কারি।  চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) রাজস্ব বিভাগের এক এসেসমেন্টে ‘ইছহাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’-এর নামে থাকা হোল্ডিংয়ের পৌরকর মূল্যায়ন ঘষামাজা করে ২০ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব কমিয়ে দেখানোর ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে চসিকের নিজস্ব তদন্তে।প্রকৃত হিসাব অনুযায়ী হোল্ডিংটির বার্ষিক কর–মূল্যায়ন ছিল ২৬ কোটি ৩৮ লাখ ১৯ হাজার ২৫০ টাকা। কিন্তু চাতুর্যের আশ্রয়ে ‘ফিল্ড বুক’-এর অঙ্ক ঘষে সেখানে থেকে ‘২’ মুছে দিয়ে কর নির্ধারণ দেখানো হয় মাত্র ৬ কোটি ৩৮ লাখ ১৯ হাজার ২৫০ টাকা। এই ভয়াবহ অনিয়মের সঙ্গে চসিকের দুই কর কর্মকর্তা ও এক হিসাব সহকারী সরাসরি জড়িত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে, আর পুরো ষড়যন্ত্রের পেছনে ছিল হোল্ডিং মালিকের আর্থিক স্বার্থ ও প্রভাব।চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের নির্দেশে গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি দীর্ঘ দশ মাসের অনুসন্ধান শেষে গত সোমবার (২০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় মেয়রের হাতে প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে উঠে আসে, কর মূল্যায়নের সরকারি নথি ঘষামাজা করে পরিবর্তন করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে, যাতে রাজস্ব আদায় কম দেখিয়ে হোল্ডিং মালিকদের সুবিধা দেওয়া যায়।তদন্ত কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, “সাদা ফ্লুইড ব্যবহার করে মূল অঙ্ক ঘষে প্রকৃত বার্ষিক মূল্যায়ন পরিবর্তন করা হয়েছে। এটি ছিল একটি সচেতন, ষড়যন্ত্রমূলক ও আর্থিক অপরাধ।”রাজস্ব বিভাগের নথি অনুযায়ী, ইছহাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ওই হোল্ডিংয়ের কর মূল্যায়ন হয় ২০১৭–২০১৮ অর্থবছরে। তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত এসেসর ২৬ কোটি টাকার মূল্য নির্ধারণ করেন, যা অনুমোদিত কপিতেও সংরক্ষিত ছিল।কিন্তু ২০২১ সালের ১৩ জুন অনুষ্ঠিত হয় আপিল রিভিউ বোর্ডের শুনানি। সেই শুনানিতে জমা দেওয়া হয় পরিবর্তিত ‘ফিল্ড বুক’, যেখানে ঘষামাজা করে ২৬ কোটির জায়গায় লেখা হয় ৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ, ‘২’ সংখ্যা কেটে দেওয়া হয় এবং ২০ কোটি টাকার কর কমিয়ে উপস্থাপন করা হয়।তদন্তে আরও জানা যায়–এই পরিবর্তনটি করা হয় আপিল রিভিউ বোর্ডে উপস্থাপনের ঠিক আগে। এমনকি সংশ্লিষ্ট রাজস্ব সার্কেলের কর্মকর্তারা বোর্ডে উপস্থাপনের আগে কোনো সত্যায়ন বা সার্টিফিকেটও প্রদান করেননি, যা নিয়মতান্ত্রিকভাবে অপরিহার্য ছিল।তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইছহাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের দুইটি হোল্ডিং–দক্ষিণ পতেঙ্গা মহল্লার ৫১৫/৩/৫৯৪ এবং দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর মহল্লার ৩১৮/৩৩১ নং হোল্ডিংয়ের ফিল্ডবুক ঘষামাজা করে কমানো হয় করের অঙ্ক। এসেসমেন্ট করেন তৎকালীন কর কর্মকর্তা দবীর আলম চৌধুরী।প্রধান কার্যালয়ে সংরক্ষিত ফিল্ডবুক ফেরত পাঠানোর পর, সার্কেল অফিস থেকে প্রস্তুত করা হয় ট্যাক্স পেয়ার লেজার ও কর নিরূপণ তালিকা। এই লেজার ও নিরূপণ তালিকায় ঘষামাজার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, কিন্তু রিভিউ বোর্ডে জমা দেওয়া ফিল্ডবুকে সংখ্যা পরিবর্তন ছিল স্পষ্ট।তদন্ত কমিটি বলছে, “এ ধরনের পরিবর্তন একজন একক কর্মকর্তার পক্ষে সম্ভব নয়; এটি ছিল সম্মিলিত অপরাধ, যার সঙ্গে হোল্ডিং মালিকের সরাসরি যোগাযোগ ও আর্থিক প্রলোভনের যোগ রয়েছে।”হিসাব সহকারী আহসান উল্লাহ তদন্ত কমিটিকে দেওয়া জবানবন্দীতে জানান, “আমি ফিল্ড বুক না দেখেই নুরুল আলম ও জয় প্রকাশ সেনের নির্দেশে স্বাক্ষর করেছি। তারা আমাকে স্বাক্ষর করতে চাপ দিয়েছিলেন।”অন্যদিকে উপ–কর কর্মকর্তা জয় প্রকাশ সেন দাবি করেন, “ফিল্ড বই আমার হেফাজতে ছিল না, আমি কোনো ঘষামাজা করিনি। তবে আমি ফিল্ডবুকে কাটাছেঁড়া দেখেছি এবং কর কর্মকর্তা নুরুল আলমকে জানিয়েছিলাম।” তিনি আরও বলেন, “নুরুল আলম আমাকে বলেছিলেন–‘এটা তোমার বিষয় না, মেয়র সাহেব জানেন।’”তবে কর কর্মকর্তা নুরুল আলম তার জবানবন্দীতে দাবি করেন, “আমি ফিল্ডবুকে কোনো অনিয়ম দেখিনি। রিভিউ বোর্ডে উপস্থিত ছিলাম, কিন্তু ঘষামাজার বিষয়ে অবগত ছিলাম না।”তদন্ত কমিটি এসব বক্তব্য বিশ্লেষণ করে স্পষ্টভাবে মন্তব্য করে–তিনজনই দোষী, কারণ তারা সবাই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন এবং একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের রক্ষা করতে চাইছেন।মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের পর বিষয়টি তার নজরে আসে। তিনি অবিলম্বে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্তে তদন্তের নির্দেশ দেন। প্রথমে চার সদস্যের কমিটি করা হয়, পরে তা সম্প্রসারিত করে পাঁচ সদস্য করা হয়। চসিকের আইন কর্মকর্তা মহিউদ্দিন মুরাদ ছিলেন কমিটির আহ্বায়ক, আর ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির চৌধুরী ছিলেন সদস্য সচিব। অন্য সদস্যরা হলেন–নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চৈতী সর্ববিদ্যা, শিক্ষা কর্মকর্তা রাশেদা আক্তার এবং কর কর্মকর্তা আব্দুল মাজিদ।দশ মাসব্যাপী অনুসন্ধানের পর তারা প্রতিবেদনে উপসংহারে বলেন, “এটি ছিল স্পষ্ট এক ষড়যন্ত্র, যেখানে সরকারি কাগজে ঘষামাজা করে রাজস্ব কমানো হয়েছে। চসিক আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।”তদন্ত কমিটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে–হোল্ডিং মালিক প্রতিষ্ঠান ইছহাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এই অপরাধের “বেনিফিশিয়ারি।” তাদের প্ররোচনায় কর মূল্যায়নের নথি পরিবর্তন করা হয়েছে, যাতে কর কমিয়ে রাজস্ব বাঁচানো যায়।তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, “এ ধরনের ষড়যন্ত্র সাধারণত অত্যন্ত গোপনে সংঘটিত হয়। এতে প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু দাপ্তরিক প্রমাণ, স্বাক্ষর, সময়সীমা ও প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করেই দায় নির্ধারণ করা সম্ভব হয়েছে।”এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি। প্রমাণিত যেভাবে অনিয়ম ঘটেছে, সেভাবেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগের মেয়রদের আমলে এসব অনিয়ম হয়েছে, কিন্তু আমি চাই কর্পোরেশন স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হোক। দুর্নীতির জায়গা চসিকে আর থাকবে না।”তিনি আরও বলেন, “এই ঘটনায় আমরা উদাহরণ তৈরি করব–যাতে ভবিষ্যতে কোনো কর্মকর্তা কিংবা করদাতা এমন অপরাধে সাহস না পায়।”তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো–প্রতিবেদনটিতে দোষীদের বিরুদ্ধে কোনো সুস্পষ্ট শাস্তিমূলক সুপারিশ করা হয়নি। তদন্তকারীরা শুধু দায় নির্ধারণ করলেও প্রশাসনিক পদক্ষেপের পরামর্শ দেননি।এসআর

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
মেঘনায় নৌপথে চাঁদাবাজির সময় যুবক গ্রেপ্তার
মেঘনায় নৌপথে চাঁদাবাজির সময় যুবক গ্রেপ্তার

কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় নৌপথে চাঁদাবাজির সময় এক যুবককে আটক করেছে চালিভাঙ্গা নৌপুলিশ।সোমবার (৬ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে উপজেলার রাধানগর Read more

বেগম জিয়ার মৃত্যুতে ইবিতে নিয়োগ বোর্ড স্থগিত 
বেগম জিয়ার মৃত্যুতে ইবিতে নিয়োগ বোর্ড স্থগিত 

সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) অনুষ্ঠিতব্য তিন বিভাগের প্রভাষক পদের নিয়োগ বোর্ড Read more

জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত গণতন্ত্র ঝুঁকিতে: তারেক রহমান
জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত গণতন্ত্র ঝুঁকিতে: তারেক রহমান

জনগণের জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত গণতন্ত্র ঝুঁকিমুক্ত নয়। অশুভ অদৃশ্য শক্তির তৎপরতা দৃশ্যমান Read more

উত্তাল সাগরে ট্রলার ডুবি: ৭ জেলে জীবিত উদ্ধার, নিখোঁজ ১
উত্তাল সাগরে ট্রলার ডুবি: ৭ জেলে জীবিত উদ্ধার, নিখোঁজ ১

ভোলার চরফ্যাশন সামরাজ মাছঘাট থেকে সাগরে মাছ শিকার করতে গিয়ে একটি ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটেছে। এতে ট্রলারে থাকা ৭ জেলে Read more

গাজীপুরে চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তারের দাবিতে এলাকাবাসীর মানববন্ধন
গাজীপুরে চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তারের দাবিতে এলাকাবাসীর মানববন্ধন

গাজীপুর সদর উপজেলায় চিহ্নিত চাঁদাবাজদের গ্রেপ্তারের দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। বুধবার (২৩ জুলাই) দুপুরে সদর উপজেলার বাঘের Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন