প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ পর্যটনের নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছিল বলে মনে করেছিলেন অনেকেই। ২০২২ সালের শেষদিকে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এই রেলপথ দিয়ে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত নিয়মিত চলেছে ট্রেন। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এই আধুনিক রেলপথই যেন রূপ নিচ্ছে এক ‘মরণফাঁদে’।মাত্র ২০ মাসে এই পথে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩০ জন। এর মধ্যে শুধু গত ১ আগস্ট ও ২ আগস্ট রামুর রশিদনগরের একটি লেভেল ক্রসিংয়ে প্রাণ গেছে ৪ জনের—একই পরিবারের ৩ সদস্যসহ সিএনজি চালক।রেলওয়ে বিভাগ জানায়, দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ১০২ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইনে রয়েছে মোট ৭২টি লেভেল ক্রসিং। কিন্তু এসবের মধ্যে গেট ও গেটম্যান রয়েছে মাত্র ১৬টিতে। বাকিগুলো পুরোপুরি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে, যেখান দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পার হচ্ছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত ইসলামাবাদ-রামু সেকশনে ১৭টি লেভেল ক্রসিং থাকলেও গেটম্যান রয়েছে মাত্র একটি। একই অবস্থা চকরিয়া, ডুলাহাজারা, হারবাং, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার বিভিন্ন সেকশনেও।অনেক জায়গায় সাইনবোর্ডে লেখা থাকলেও—এই গেটে কোনো গেটম্যান নাই, নিজ দায়িত্বে পারাপার করুন—বাস্তবে তা জীবন বাঁচাতে ব্যর্থ হচ্ছে বারবার।গত ২ আগস্ট বিকেলে রামুর রশিদনগর এলাকার একটি অনুমোদিত ক্রসিংয়ে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী একটি ট্রেন অটোরিকশাকে ধাক্কা দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার টেনে নিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান সিএনজি চালক এবং একই পরিবারের ৩ জন।প্রত্যক্ষদর্শী নবাব মিয়া বলেন, ‘এই ক্রসিংয়ে কোনো গেট বা সিগন্যাল নেই। প্রতিদিন ট্রেনের সময় আন্দাজ করে পার হতে হয়। আতঙ্কে থাকতে হয় সবসময়।’তিনি আরও জানান, বহু দুর্ঘটনার মূল কারণ হলো দৃশ্যমানতার ঘাটতি। গাছপালা ও বাঁক থাকার কারণে ট্রেন আসা বোঝা যায় না। ফলে অনেক সময় চালক বা পথচারীরা হুইসেল শুনতে না পেয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করেন এবং দুর্ঘটনায় পড়েন।রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ চালু হলেও এখানকার স্থায়ী জনবল এখনো অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পায়নি। ফলে প্রকল্পের আওতায় অস্থায়ী কিছু গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যেটা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।প্রকল্প পরিচালক মো. সবুক্তগীন বলেন, ‘সব লেভেল ক্রসিং অনুমোদিত। কিছু জায়গায় গেটম্যান দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোতে ব্যবস্থা নিতে প্রক্রিয়া চলছে।’তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনা কমাতে ইতোমধ্যে ৪৬টি আন্ডারপাস নির্মাণ করা হয়েছে। তবে জনসচেতনতা তৈরি না হলে দুর্ঘটনা পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়।চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার আধুনগর উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে তিনপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলক্রসিং রয়েছে। প্রতিদিন এই পয়েন্ট দিয়ে চলাচল করেন প্রায় ৫ হাজার পথচারী। অথচ সেখানে নেই কোনো গেট বা গেটম্যান।স্থানীয় চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘অবস্থা এমন যে, যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।’চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মাহমুদ ওমর ইমাম বলেন, ‘যেসব ক্রসিং ব্যস্ত এবং যেখানে দৃশ্যমানতা কম, সেখানে অবশ্যই স্বয়ংক্রিয় ব্যারিয়ার, সিগন্যাল লাইট ও সার্বক্ষণিক গেটম্যান থাকা উচিত।’কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশনের মাস্টার মো. গোলাম রব্বানী বলেন, ‘শুধু অবকাঠামো নয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা গেলে দুর্ঘটনা অনেকটাই কমে আসবে।’৩ আগস্ট দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান কক্সবাজার সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফার ইয়াছমিন। তিনি জানান, ‘এখনো রেলপথ প্রকল্পটি রেল কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর হয়নি। ফলে রেল বিভাগও চাইলেই স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে পারছে না।’তবে আপৎকালীন ভিত্তিতে রেল কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।স্থানীয়দের মতে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ দেশের আধুনিক রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি বড় উদাহরণ হলেও অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংগুলোর কারণে এটি এখন পরিণত হয়েছে এক মৃত্যুফাঁদে। পর্যটন সুবিধা ও উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে চালু করা এই রেলপথকে নিরাপদ করতে না পারলে প্রতিটি ট্রেন চলাচল হয়ে উঠবে জীবনের ঝুঁকির সমান।সরকার, রেল বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় ঘটিয়ে যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
