যশোর জেলার শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী সাতমাইল গরুর হাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক অভিনব ব্যবসায়িক উদ্যোগ। হাটে আসা অবিক্রিত ও হাটে তোলার আগে গরুগুলোর নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য বর্তমানে এ এলাকায় প্রায় ৭০টি ‘গরু হোটেল’ বা স্থানীয় ভাষায় খাটাল চালু রয়েছে। মূলত দূর-দূরান্ত থেকে আসা গরু ব্যবসায়ীদের ঝামেলা ও পরিবহন খরচ কমাতে এই গরুর হোটেলগুলো এখন অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।সাতমাইলের পশুর হাট বসে প্রতি শনি ও মঙ্গলবার। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সর্ববৃহৎ পশুর হাট। এই হাটের আশপাশেই রয়েছে গোটা ৭০টি ‘গরুর হোটেল’। যেখানে বিশ্রামে থাকে গরু, বিনিময়ে গরুর মালিককে দিতে হয় টাকা।এই গরুর হোটেলে গরুর আকার ও অবস্থানকাল অনুযায়ী ভাড়ার তালিকা ভিন্ন ভিন্ন। বড় গরুর জন্য প্রতিদিন ২০০ টাকা, মাঝারি গরুর জন্য ১৫০ টাকা এবং ছোট গরুর জন্য ১০০ টাকা রাখা হয়। অনেক সময় সাময়িক বিশ্রামের জন্য গরু রাখলে মাত্র ৩০ টাকা ফি দিতে হয়।সেবার মান নিশ্চিতে খাটালগুলোতে আধুনিকতার ছোঁয়াও লেগেছে। খড় বা বিচালী দ্রুত কাটার জন্য বসানো হয়েছে বৈদ্যুতিক মেশিন। গরুর খাওয়ার জন্য প্রতিটি হোটেলে রয়েছে অন্তত ৩০টি নান্দা (খাওয়ার পাত্র)।গরুর হোটেল পরিচালনা করেছেন সাতমাইলসহ আশেপাশের এলাকার মনিরুজ্জামান সুজন, ইব্রাহিম খলিল রাসেল, আব্দুল জলিল, মশিয়ার রহমান, দিপু, রফিক, রাশেদ, ওয়াজেদ, খালেক, জাহিদ, সোহাগ, বাবুল, বাবুসহ আরো অনেকে।হাটে উঠানো গরু যদি কোনো কারণে বিক্রি না হয়, তবে সেই গরু পুনরায় বাড়িতে বা নিজ গন্তব্যে ফিরিয়ে নেওয়া ব্যবসায়ীদের জন্য বেশ ব্যয়বহুল এবং কষ্টসাধ্য। এই সমস্যা সমাধানেই স্থানীয় উদ্যোক্তারা ব্যক্তিগত বা ভাড়া করা জমিতে গরুর হোটেল তৈরি করেছেন।ইব্রাহিম খলিল রাসেল নামের একজন খাটাল মালিক জানান, সে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা অগ্রিম দিয়ে মাসিক সাড়ে ৬ হাজার টাকা ভাড়ায় জায়গা লিজ নিয়ে এই গরুর হোটেল পরিচালনা করছেন। মানুষের হোস্টেলের মতোই এখানে গরুর থাকা, খাওয়া ও গোসলের সুব্যবস্থা রয়েছে। গরুর হোটেল ব্যবসার মাধ্যমে স্থানীয় অনেক বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক শ্রম দিয়েই এই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। আবার অনেকে লোক রেখে কাজ করছেন।খাটাল মালিকরা জানান, আগে যখন ভারতীয় গরু পর্যাপ্ত পরিমাণে আসত, তখন তাদের আয় ও ব্যস্ততা অনেক বেশি ছিল। বর্তমানে ভারতীয় গরুর আমদানি কম থাকায় আয় কিছুটা কমলেও তারা এ ব্যবসাই আঁকড়ে ধরে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা করছেন।গত মঙ্গলবার হাট থেকে একটি গরু কিনে আনেন পাশের কলারোয়া উপজেলার চন্দনপুর এলাকার শাহাদত হোসেন নামে এক ব্যক্তি। রাখেন হাটের ভেতরেই থাকা গরুর জন্য তৈরি একটি হোটেল বা রেস্টহাউজে। স্থানীয়রা অবশ্য একে বলে ‘খাটাল’। বৈশাখের তীব্র গরমে একটু প্রশান্তির জন্য এই রেস্ট হাউজে থাকা মোটর ছেড়ে পাইপে করে পানি ছিটিয়ে গরুটিকে গোসল করিয়ে দিচ্ছিলেন তার মালিক। আর এই গরুর হোটেলের মালিকের নাম মনিরুজ্জামান সুজন। স্থানীয় একটি মাদ্রাসার জমিতে গরুর নিরাপদে রাতযাপনে বছর চারেক আগে তৈরি করেন এই প্রতিষ্ঠানটি।মনিরুজ্জামান সুজন বলেন, জায়গাটি ভাড়া নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে বছর চারেক আগে এখানে নিজ খরচে একটি শেড তৈরি করি। এই শেডে ২৫টি এঁড়ে গরু রাখা যায়। তবে গাইগরু হলে কিছু বেশি হয় সংখ্যায়। হাটে দূর-দূরান্ত থেকে যারা গরু বিক্রি করতে আসেন, তাদের যেসব গরু সেই হাটে বিক্রি হয় না, সেগুলো রেখে যান। পরবর্তী হাটে এখান থেকেই বিক্রির জন্য তোলেন। সেক্ষেত্রে গরুপ্রতি (এঁড়ে) প্রতিদিন দুইশ টাকা এবং গাইগরু হলে একশ টাকা দিতে হয়। সেবা হিসাবে এখানে নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা, বিচুলি (খড়) আর পানি দেওয়া হয়।আর গরুমালিক যদি চান বিচুলির সঙ্গে খৈল, ভুষি ইত্যাদি খাওয়াতে পারেন। মাসে কেমন আয়-রোজগার হয় জানতে চাইলে সুজন বলেন, খেয়ে পরে বেঁচে আছি ভাই। মাসশেষে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে পাঁচ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ বিল আর একজন শ্রমিকের খরচ বাদ দিয়ে চলে যাচ্ছে।সাতমাইল এলাকার খাটাল মালিক আব্দুল খালেক বলেন, গরুর সেবার জন্য তৈরি এসব প্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় লোকজন বলে খাটাল। কিন্তু আমি বলি, গরুর রেস্ট হাউজ। ১০-১২ বছর ধরে আমিও এই ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত। প্রায় দেড় বছর ধরে ভর্তুকি দিয়ে আসছি। তিনি বলেন, হাটে যে গরু বিক্রি হয় না, পরের হাটে পরিবহণ খরচ বাঁচাতে কিংবা ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট এড়াতেই মূলত লোকজন তাদের গরু রেখে যান। আমরা সে সব গরুর দেখভাল করি। গরুর জন্য পানি আর বিচালি সরবরাহ করি। গরুর মালিক চাইলে ভুষি, খৈল, খুদ বা গরুর জন্য যা যা পুষ্টিকর, সেগুলো সরবরাহ করেন। গরুপ্রতি প্রতিদিন তাকে দিতে হয় একশ টাকা। আর শুধু দিনের বেলায় রাখলে দিতে হয় ত্রিশ টাকা।মাসে মাসে কেন ভর্তুকি দিচ্ছেন-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগে যখন বাজার ভালো ছিল, তখন প্রতি হাটে সব বাদে ৫-৬ হাজার টাকা থাকত। আগে যেভাবে ব্যবসা করেছি, এখন তার জন্য ভর্তুকি দিচ্ছি। আবারও যদি ভারত বা মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে গরু আসে, আমাদের এই হাটের ব্যবসা ফের জমজমাট হবে।হাটের ঠিক উলটো পাশে বাগআঁচড়া গ্রাম। এই এলাকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি গরুর হোটেল। গলির ভেতর রাস্তার গায়ে প্রথম যে দোতলা বাড়ি, তার মালিকের নাম মনিরুজ্জামান মনি। উপরে সপরিবারে থাকেন মনি, নিচতলায় রয়েছে গরুর হোটেলটি। মনি বলেন, তিন শতক জমির উপরে এই দোতলা করেছি। গরুর জন্য তৈরি আমার এই ‘রেস্ট হাউজের’ আয়েই চলে সংসার। তিনি বলেন, বছর ১২ আগে আমাদের এই ব্যবসা ছিল জমজমাট। তখন ভারত থেকে গরু আসত দেদার। মানুষজন টাকা-পয়সার দিকে তাকাত না। অনেকেই তাদের গরু রেখে যেত, আমাদের আয়-রোজগারও ভালো হতো। প্রসঙ্গত, ৫ আগস্টের পর নানা কারণে সাতমাইলের এই পশুর হাটের ব্যবসা খারাপ যাচ্ছিল। মাঝে মধ্যে জমজমাট হয়ে উঠলেও নানা কারণে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। সামনে কোরবানির ঈদ ঘিরে হাটটি আগের অবস্থায় ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।বিভিন্ন গরুর হোটেল মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এলাকার বাইরের ব্যাপারিরা এসব হোটেলে গরু বেশি রাখে। ব্যাপারির মধ্যে রয়েছে নোয়াখালীর মোমিনুর রহমান, সোহাগ, সিরাজ, ঢাকার নজরুল নজু, সাত্তার সাপ্লাই, বরিশালে নিজাম উদ্দিন, চট্রগ্রামের সবুজ, কক্সবাজারের সাত্তারসহ আরো অনেকে।কথা হয় নোয়াখালীর মোমিনুর রহমান ও ঢাকার নজরুল নজুর সাথে তারা জানান, আমরা ব্যবসায়ীরা এক সাথে অনেক গরু হাট থেকে কিনি। যাবাহন সংকটের কারণে এতো গরু এক সাথে পাঠানো সম্ভব হয় না। সে কারণে কিছু গরু আমরা এসব গরুর হোটেলে রেখে দেই। গরুর হোটেলের মালিকরা তাদের নিজেদের গরু ভেবে দেখাশুনা করে থাকে। গরুর জন্য পানি আর বিচালি সরবরাহ করে থাকে মালিকরা। আমরা মাঝে মধ্যে ভুষি, খৈল, খুদ বা গরুর জন্য যা যা পুষ্টিকর, সেগুলো সরবরাহ করি। এসব গরুকে খাওয়ানো হয়ে থাকে।সাতমাইল হাটের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও হাটের অবকাঠামোগত কিছু সমস্যা এখনও রয়ে গেছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব, পর্যাপ্ত শেড না থাকা এবং যাতায়াতের রাস্তার সমস্যার কারণে ব্যবসায়ীরা ভোগান্তিতে পড়েন। এসব সমস্যার সমাধান হলে সাতমাইল হাট ও গরুর হোটেলগুলো দেশের গবাদিপশু বাণিজ্যে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন গরুর হোটেল মালিক জানান, গত দুই হাটে কোন গরু সাতমাইল হাটে উঠতে দেয়নি একটি মহল। সরকারি ভাবে হাট পরিচালনা হওয়ায় রাজস্ব আদায়ে বিঘ্ন সৃষ্টি করে এলাকার কতিপয় ক্ষমতাসীন দলের লোকজন সিন্ডিকেট করে অন্যস্থানে রেখে সিন্ডিকেটের সদস্যরা পাশবিহীন নগদ টাকা নিয়ে গরু বের করে দিয়ে সরকারি রাজস্ব আদায়ে বাধা সৃষ্টি করছে। এর ফলে আমাদের গরুর হোটেলে তেমন গরু রাখছে না গরুর মালিকরা। আমরা অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া সাতমাইল পশুহাটটি দীর্ঘদিন ধরেই ইজারা জটিলতায় রয়েছে। অতীতে প্রভাবশালী মহল ইজারা ছাড়াই নামমাত্র  চার ভাগের এক ভাগ টাকা জমা দিয়ে খাজনা আদায় করত। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও একটি সিন্ডিকেট হাটের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা প্রশাসন একাধিকবার দরপত্র আহ্বান করেও হাটটি ইজারা দিতে পারেনি। সর্বশেষ প্রশাসন নিজ উদ্যোগে খাজনা আদায় শুরু করলে শনিবার ও মঙ্গলবার হাটে গরু ওঠা বন্ধ করে দেওয়া হয়।এসআর  

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
কালিয়াকৈরে শিশু ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে দিনমজুর আটক
কালিয়াকৈরে শিশু ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে দিনমজুর আটক

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার মাটিকাটা এলাকায় ৯ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে কফিল উদ্দিন (৫০) নামে এক দিনমজুরকে আটক করেছে Read more

ধামইরহাটে ছাত্রদলের প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত
ধামইরহাটে ছাত্রদলের প্রতিবাদ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত

নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী এবং ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যাকাণ্ডের সহিত জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক Read more

ডাকসু নির্বাচন: আজ এড়িয়ে চলবেন রাজধানীর যেসব সড়ক
ডাকসু নির্বাচন: আজ এড়িয়ে চলবেন রাজধানীর যেসব সড়ক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন আজ। এ উপলক্ষে মঙ্গলবার (৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পার্শ্ববর্তী এলাকার Read more

জামালপুরে ব্রিজ ভেঙে নদীতে পড়ল শতাধিক মানুষ, নিহত ৩
জামালপুরে ব্রিজ ভেঙে নদীতে পড়ল শতাধিক মানুষ, নিহত ৩

জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ মডেল থানার সামনে ব্রহ্মপুত্র নদের উপর নির্মিত একটি ভাসমান ড্রাম ব্রিজ ভেঙে শতাধিক মানুষ নদীতে পড়ে গেলে Read more

উলিপু‌রে ৬ জুয়া‌ড়ি আটক
উলিপু‌রে ৬ জুয়া‌ড়ি আটক

কুড়িগ্রামের উলিপু‌রে জুয়া খেলা অবস্থায় ৬ জুয়া‌ড়িকে আটক ক‌রে‌ছে পু‌লিশ। বৃহস্প‌তিবার (০২ এপ্রিল) দিবাগত রা‌ত পৌনে দুইটায় উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়‌নের Read more

যশোরে দুই ভাইকে কুপিয়ে হত্যা চেষ্টা
যশোরে দুই ভাইকে কুপিয়ে হত্যা চেষ্টা

যশোর সদর উপজেলার কচুয়া গ্রামে দুই ভাইকে কুপিয়ে হত্যা চেষ্টা করা হয়েছে। জমি নিয়ে বিরোধের জের ধরে মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন