রবি আলম আর শরিফ—দুজনেরই বয়স এমন এক সন্ধিক্ষণে, যখন ঈদ মানেই নতুন জামার ঘ্রাণ আর বন্ধুদের সঙ্গে উৎসবে মেতে ওঠা। কিন্তু এবারের ঈদে তাদের ঘরে নেই কোনো নতুন পোশাক, নেই কোনো হাসি। আছে শুধু অজানা এক অন্ধকার—যেখানে তারা বন্দি। আর এপাড়ে তাদের জন্য বিষণ্ণ অপেক্ষায় প্রহর গুনছে দুটি শূন্য ঘর।টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের সরু গলিতে ঢুকলেই বোঝা যায় বেদনার ভার কতটা গভীর। নাফ নদীর মোহনা থেকে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে অপহৃত অসংখ্য জেলের মধ্যে এই দুই কিশোরও রয়েছে। তাদের অনুপস্থিতিতে থমকে আছে পুরো পরিবার। শুধু রবি বা শরিফ নয়, এই জনপদের ঘরে ঘরে এখন একই হাহাকার। কেউ হারিয়েছেন স্বামী, কেউ বাবা, কেউবা আদরের সন্তান।জালিয়া পাড়া এলাকায় নিখোঁজ জেলে মো. আবুল কালামের স্ত্রী রাবেয়া বেগম দরজার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, “সন্ধ্যা হলে মনে হয় এই বুঝি ও ফিরে এল। মোবাইলটা হাতে নিয়ে বসে থাকি একটা কলের আশায়। ঈদ আসছে, কিন্তু আমার ঘরে তো ঈদ নেই।” তার মেয়ে খুরশিদা আক্তারের কণ্ঠে ঝরছিল কান্না, “আব্বু প্রতি ঈদে আমার জন্য লাল জামা আনত। এবার আমি কিচ্ছু চাই না, শুধু আব্বুকে ফিরে পেতে চাই।”একই অবস্থা বৃদ্ধা হাজেরা খাতুনের। ছেলে আবদুর শুকুর ছিল সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী। এখন মানুষের কাছে ধার করে দিন কাটছে তাঁর। অভাবের তাড়নায় কিশোর ছেলে রবি আলমকে নদীতে পাঠিয়ে এখন দিশেহারা মা জমিলা খাতুন। তিনি ডুকরে কেঁদে বলেন, “ওর তো এখন স্কুলে থাকার কথা ছিল। ছেলেটা কোথায় আছে, বেঁচে আছে না মরে গেছে—কিছুই জানি না।”স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে নাফ নদী ও সীমান্ত এলাকা থেকে অন্তত পাঁচ শতাধিক জেলে অপহৃত হয়েছেন। বিজিবি ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে দেড় শতাধিক ফিরলেও এখনো প্রায় সাড়ে তিনশ জেলে নিখোঁজ বা জিম্মি অবস্থায় রয়েছেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) বিকেলে ঘোলারচর এলাকা থেকে আরও তিনজনকে ধরে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। তার দুই দিন আগে একটি নৌকাসহ আরও চারজনকে অপহরণ করা হয়।সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, “জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়া এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জেলেরা প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে নদীতে নামেন। এই আতঙ্ক এখন পুরো জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে।”টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ইনামুল হাফিজ নাদিম জানান, জেলেদের ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি নৌকার মালিকদের মাধ্যমে তাঁরা জেনেছেন। অপহৃতদের উদ্ধারে বিজিবি ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। ইতিপূর্বেও অনেককে আলোচনার মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।শাহপরীর দ্বীপের বৃদ্ধা কুলসুমা বিড়বিড় করে বলছিলেন, “ছেলে নেই, ঈদ দিয়ে কী করব বাবা?” এই একটি বাক্যেই ফুটে ওঠে পুরো জনপদের চিত্র। এবারের ঈদে এই পল্লির অনেক ঘরেই জ্বলবে না চুলা, কেনা হবে না নতুন কাপড়। ঈদের নামাজ শেষে কেউ যাবেন কবর জিয়ারতে, আর কেউ হয়তো নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দিগন্তে চোখ রাখবেন—যদি প্রিয় মানুষটি ফিরে আসে। উৎসবের আলোয় এই মানুষগুলোর কান্না হয়তো ঢাকা পড়ে যাবে, কিন্তু নাফ নদীর ঢেউয়ের মতোই তাঁদের দীর্ঘশ্বাস রয়ে যাবে অতল ও অন্তহীন।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
