রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার ঝিকরা এলাকায় আজও ইতিহাসের নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি পুরাতন স্থাপনা—লাহিড়ী টাওয়ার, যাকে স্থানীয়ভাবে লাহিড়ী মঠ নামেও ডাকা হয়। প্রায় ৭০০ ফুট উচ্চতার এই দুটি টাওয়ার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সতেরো শতকের শেষদিকে, দূর্গা লাহিড়ীর হাত ধরে, যিনি ছিলেন ক্ষুদ্র জমিদার হলেও তেভাগা আন্দোলনের একজন অন্যতম নেতা ও সমাজসচেতন ব্যক্তিত্ব। দূর্গা লাহিড়ী ছিলেন সাড়ে সাত শত একরের জমির মালিক। তিনি শুধু জমিদার ছিলেন না, ছিলেন কৃষকবান্ধব মানুষও—অনেক কৃষক তার কাছে নিজেদের সঞ্চয় জমা রাখতেন। তার বিরল সম্পদের খ্যাতি এতটাই ছিল যে, নৌপথে এসে ডাকাত দল তাকে তিনবার আক্রমণ করে। শেষবারের হামলায় দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন দূর্গা লাহিড়ী। ডাকাতেরা লুট করে নিয়ে যায় দৃশ্যমান সব সম্পদ। শোনা যায়, তিনি বহু মূল্যবান ধন-সম্পদ মাটির নিচে চিহ্ন দিয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন, যেগুলোর কিছু অংশ স্থানীয় বাসিন্দারা জমি খননের সময় আজও খুঁজে পান। তার মৃত্যুকালে স্ত্রী ভানুমতি ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা, বাবার বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের দিনাজপুরে অবস্থান করছিলেন। সেখানেই জন্ম হয় তাদের পুত্র কার্তিক লাহিড়ীর। কিন্তু তার হাত ধরেই ধীরে ধীরে ম্লান হতে থাকে লাহিড়ী জমিদারির চিহ্ন। জমির মালিকানা কিছুটা থাকলেও সম্পদের অধিকাংশই হারিয়ে ফেলে পরিবারটি। বর্তমানে লাহিড়ী পরিবার থেকে মাত্র দুই বিঘা জমি তাদের দখলে রয়েছে। উত্তরসূরি মিঠু লাহিড়ী বর্তমানে বগুড়ার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পরিবারটির অনেক ওয়ারিশ ভারতে চলে গেছেন জমি বিক্রয় করে। লাহিড়ী টাওয়ার আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেন কালের সাক্ষী হয়ে। এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং একটি যুগের স্মৃতি, এক বিস্মৃতপ্রায় ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। এ বিষয়ে রাজশাহী বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এ মঠটি দীর্ঘদিন যাবত পরিত্যক্ত হয়ে আছে, এর যে সমৃদ্ধ ইতিহাস তা আজও আমাদের ভাবায়। এটির সংস্কার করা হলে বাগমারা তথা রাজশাহীবাসীর একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হবে এটি।’ এই টাওয়ারটি শুধু স্থানীয়দের কাছে নয়, ইতিহাস অনুরাগীদের কাছেও এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যভিত্তিক জায়গা। তবে যদি এর যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচার করা যায়, তাহলে এটি হতে পারে বাগমারা উপজেলার একটি অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
