কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার হলদিয়া পালং ইউনিয়নের বক্তাতলী। দেখতে শান্ত, নিরীহ এক গ্রামীণ জনপদ। দিনের আলোয় এখানকার জীবনযাত্রা সাধারণ গ্রামের মতোই। কিন্তু স্থানীয়দের ভাষ্য, এই নীরবতার আড়ালেই গড়ে উঠেছে একটি সংগঠিত অপরাধচক্র। যার কেন্দ্রে আছেন কামাল উদ্দিন। এলাকায় যিনি ‘৩৭ কামাল’ নামেই বেশি পরিচিত।একসময় দিনমজুরি, ছোটখাটো ব্যবসা আর মুরগির খামারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল তার জীবন। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়ে ওঠা এই ব্যক্তির উত্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল এলাকায়। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই উত্থানের পেছনে রয়েছে সীমান্তভিত্তিক ইয়াবা পাচার, সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক, একটি হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এবং বনভূমি দখলের মতো গুরুতর বিষয়।কামাল উদ্দিন, স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিমের ছেলে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে জীবনের শুরুটা ছিল সাধারণ মানুষের মতোই। ক্ষেতখামারে কাজ, অন্যের বাড়িতে দিনমজুরি কিংবা পরে মুরগির খামার ও চায়ের দোকান চালানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এসব উদ্যোগ থেকে বড় ধরনের আয়ের কোনো প্রমাণ মেলেনি।তবুও কয়েক বছরের মধ্যে বদলে যায় তার জীবনযাত্রা। বক্তাতলীতে নির্মাণ করেন দৃষ্টিনন্দন বাড়ি। কোর্টবাজার এলাকায় ক্রয় করেছেন জমি। ব্যবহার করেন ২০২১ মডেলের একটি নোয়া গাড়ি। পাশাপাশি রয়েছে একাধিক দামি মোটরসাইকেল। শেয়ার কিনেছেন মরিচ্যা বাজারের আল মারওয়া হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের।একজন বাসিন্দা বলেন, যে লোক কিছুদিন আগেও দিনমজুরি করত, সে হঠাৎ এত সম্পদের মালিক হলো কীভাবে- এই প্রশ্ন সবার মনে।স্থানীয়দের তথ্য ও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তকেন্দ্রিক ইয়াবা পাচারের একটি রুটে সক্রিয় রয়েছে কামালের নেতৃত্বাধীন একটি সিন্ডিকেট। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই নেটওয়ার্কটি তিনটি স্তরে কাজ করে- সংগ্রহ, সংরক্ষণ, সরবরাহপ্রতিটি স্তরে আলাদা দল, আলাদা দায়িত্ব। এক স্তরের সদস্য অন্য স্তরের পুরো তথ্য জানে না। ফলে কেউ ধরা পড়লেও পুরো চক্র উন্মোচিত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে।পাচারের কৌশলও বৈচিত্র্যময়। ব্যবহার করা হয় সিএনজির গোপন চেম্বার, মোটরসাইকেলের পরিবর্তিত যন্ত্রাংশ দিনমজুরের ছদ্মবেশে ‘ক্যারিয়ার’।স্থানীয়দের দাবি, রাত নামলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে এই নেটওয়ার্ক। দিনের বেলায় এলাকাটি স্বাভাবিক থাকলেও রাতের অন্ধকারে চলে নিষিদ্ধ কারবার। ‘বইল্লা বড় আলম’ হত্যার অভিযোগ এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ‘বইল্লা বড় আলম’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তির মৃত্যু।স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আলম এই সিন্ডিকেটের একজন বাহক ছিলেন। একটি বড় চালান বহনের সময়- যেখানে প্রায় ৭০ হাজার পিস ইয়াবা ছিল। পাচারের সময় ওই ইয়াবাসহ তিনি নিহত হন।এলাকাবাসীর দাবি, ওই চালানকে কেন্দ্র করে সিন্ডিকেটের ভেতরেই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। সেই কোন্দল থেকেই খুন হন আলম। এই ঘটনায় রহস্যজনক কারণে কামাল উদ্দিনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠলেও, তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।একজন স্থানীয় দোকানদার বলেন, সবাই জানে কী হয়েছে, কিন্তু কাগজে-কলমে কিছুই নেই। এটাই সবচেয়ে ভয়ের।মাদক কারবারের পাশাপাশি কামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে বনভূমি দখলের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বক্তাতলী এলাকায় একই ইউনিয়নের এক জনপ্রতিনিধির সঙ্গে যোগসাজশে প্রায় চার একর বনভূমি দখল করা হয়েছে। এই জমিতে বিভিন্ন স্থাপনা ও ব্যবহার শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় ক্ষোভ বাড়ছে।একজন সমাজকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বনের জমি দখল হচ্ছে, অথচ কেউ কিছু বলছে না। উল্টো যারা বলবে, তারাই বিপদে পড়বে। এমন একটা ভয় কাজ করে।কামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি সরাসরি সামনে থাকেন না। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুরো নেটওয়ার্কটি পরিচালিত হয় মধ্যবর্তী স্তরের মাধ্যমে। বাহকরা জানে না মূল পরিচালকের পরিচয়। মাঝের স্তরগুলো সীমিত তথ্য জানে। সিদ্ধান্ত আসে ‘উপর থেকে’, কিন্তু নাম থাকে আড়ালে। এই কাঠামোর কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য পুরো চক্র ধরাটা কঠিন হয়ে পড়ে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।উখিয়ার এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে এমন কার্যক্রম চললেও প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। সিএনজি ও মোটরসাইকেলে করে নিয়মিত ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক পাচার হয়েছে- এমন দাবি থাকলেও তা প্রতিরোধ বা শনাক্ত করার দৃশ্যমান উদ্যোগ একদম কম বলে জানা গেছে।স্থানীয় এক যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাতের বেলায় কী হয়, সেটা অনেকেই জানে। কিন্তু কেউ দেখে না, কেউ শোনে না- এইটাই বাস্তবতা।বক্তাতলীর মানুষ বলছেন, ‘৩৭ কামাল’-এর গল্প শুধু একজন ব্যক্তির উত্থান নয়। এটি এমন এক বাস্তবতা, যেখানে অপরাধ টিকে থাকে নীরবতার আড়ালে, আর প্রশ্নগুলো থেকে যায় উত্তরহীন। দিনের আলোয় স্বাভাবিক গ্রাম, আর রাতের অন্ধকারে সক্রিয় নেটওয়ার্ক- এই দ্বৈত বাস্তবতার মাঝেই বসবাস করছেন সাধারণ মানুষ।এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ‘৩৭ কামাল’ অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বলেন, আমি কখনো দিনমজুরের কাজ করিনি; ছোটবেলা থেকেই পান ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। বর্তমানে গরুর ব্যবসা করে এই গাড়ি কিনেছি। এছাড়া ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মাত্র এক লাখ টাকা বিনিয়োগ করে অংশীদার হয়েছি। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো নথি বা প্রমাণ তিনি প্রতিবেদককে দেখাতে পারেননি।উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমান বলেন, এর আগে তার সম্পর্কে কোনো তথ্য আমার জানা ছিল না। আপনি তার পূর্ণ নাম-ঠিকানা ও বিস্তারিত তথ্য দিলে আমরা বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
