দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় যেন প্রকাশ্যেই চলছে জ্বালানি প্রতারণার এক নীরব মহোৎসব। উপজেলার হলদিপাড়ায় অবস্থিত খানসামা ফিলিং স্টেশনকে ঘিরে উঠেছে ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগ—যেখানে গ্রাহকদের কাছ থেকে পুরো টাকা নেওয়া হলেও দেওয়া হচ্ছে কম পরিমাণ জ্বালানি। আর এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভে ফুঁসছে সাধারণ মানুষ।শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালকরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অকটেন ও ডিজেল সংগ্রহ করছেন। কিন্তু অনেকেই অভিযোগ করছেন—১ হাজার টাকার জ্বালানি কিনলেও বাস্তবে পাচ্ছেন প্রায় ৮শ টাকার সমপরিমাণ তেল। একইভাবে ৬শ টাকায় দেওয়া হচ্ছে প্রায় ৫শ টাকার জ্বালানি। অর্থাৎ প্রতিটি লেনদেনেই গ্রাহকদের পকেট কাটা হচ্ছে প্রকাশ্যেই।ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে বিষয়টি বুঝতে না পারলেও পরে মাইলেজ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া এবং ট্যাংকে তেলের পরিমাণে গরমিল দেখে প্রতারণার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এতে ক্ষোভ বাড়ছে প্রতিনিয়ত।স্থানীয় গ্রাহক মোস্তাফিজুর রহমান ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন, “এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল নিলাম। ১ হাজার টাকা দিলাম, কিন্তু পরে বুঝলাম তেল পেয়েছি অনেক কম। এটা সরাসরি ডাকাতি ছাড়া কিছু না।আরেক ভুক্তভোগী সোহান আলী আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে বলেন, “আমার ছেলে ৪১৯০ টাকার ডিজেল নেয়। ৪৫০০ টাকা দিলে ১৫০ টাকা ফেরত দেয়। পরে বাকি ১৬০ টাকা চাইলে কর্মচারী বলে—‘মহাজনের সঙ্গে কথা বলেন’। পরে মহাজনের কাছে গিয়ে টাকা ফেরত পাই। এটা কোনো পাম্পের আচরণ হতে পারে?”এদিকে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, পাম্প কর্তৃপক্ষের আচরণ অত্যন্ত রূঢ় এবং গ্রাহকবান্ধব নয়। তিনি বলেন, “তারা নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে সবকিছু চালিয়ে যাচ্ছে। কেউ কিছু বলতে সাহস পায় না।সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এত বড় অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও স্থানীয় প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা নেই। এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের অনিয়ম চলে আসছে; কিন্তু কোনো অভিযান বা নজরদারি চোখে পড়েনি।অভিযোগের বিষয়ে ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী অলেমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এতে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুজ্জামান সরকার বলেন, এ বিষয়ে কেউ লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন—প্রকাশ্যে এমন অভিযোগ ওঠার পরও প্রশাসনের নিজ উদ্যোগে তদন্ত না করা কতটা যৌক্তিক?অন্যদিকে, জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম–এর সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি, যা নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ ও হতাশা।বিভাগীয় কমিশনার মো. শহিদুল ইসলাম তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বিষয়টি দেখছি। তবে তার এই মন্তব্যে আশ্বস্ত হতে পারছেন না ভুক্তভোগীরা।এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনের নীরবতাই অসাধু ব্যবসায়ীদের সাহস জুগিয়ে দিচ্ছে। ফলে প্রতিদিনই সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, অথচ প্রতিকার মিলছে না।জনগণের জোর দাবি—অবিলম্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে সংশ্লিষ্ট পাম্পে অভিযান চালাতে হবে। একই সঙ্গে মিটার ও পরিমাপ যন্ত্র পরীক্ষা করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।অন্যথায়, এই প্রকাশ্য লুটপাট’ থামবে না—বরং আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। জ্বালানি খাতে এমন অনিয়ম শুধু গ্রাহকদের আর্থিক ক্ষতিই করছে না; বরং এটি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপরও বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়—প্রশাসন এই অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেয়, নাকি নীরব দর্শকের ভূমিকাতেই থেকে যায়।ইখা
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
