সাভারের আলোচিত ও কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার মশিউর রহমান খান সম্রাট ওরফে সাইকো সম্রাট সোমবার (২৩ মার্চ) সকালে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে মারা গেছেন। এ মধ্য দিয়ে সাইকো সম্রাট পর্বের অবসান হলো।কারাগারে সকাল সাড়ে ৭ টায় হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করলে কারা কর্তৃপক্ষ দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হার্ট স্ট্রোকজনিত কারণে তার মৃত্যু হয়। সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হেলাল উদ্দিন দুপুরে যুগান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সাভার পৌর এলাকার একটি পরিত্যক্ত ভবনকে মৃত্যুফাঁদে পরিণত করা এই সিরিয়াল কিলারের মৃত্যুতে শেষ হলো এক ভয়ংকর অপরাধ অধ্যায়, যা জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল।গত ১৮ জানুয়ারি সাভার থানা রোডের পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে দুটি মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে নতুন করে সামনে আসে তার নির্মম অপরাধের চিত্র। এর আগে একই ভবন থেকে আরও তিনটি মরদেহ এবং সাভার মডেল মসজিদের সামনে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ দেখতে পায়, সম্রাট নিজ কাঁধে করে মরদেহ ভবনের নিচতলা নিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনার পর বিগত ৬ মাসে ওই ভবনে কয়েকটি হত্যার জট খুলতে পুলিশ ও গণমাধ্যম কর্মীরা তৎপরতা বৃদ্ধি করে।লাশ বহনের আগের দিন ধারণ করা একটি ভিডিওতে তাকে এক নারীর সঙ্গে ওই পরিত্যক্ত ভবনে দেখা যায়; পরে নিশ্চিত হয়, সেই নারীকে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দেয় সম্রাট। তদন্তে নেমে পুলিশ তার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পেয়ে গ্রেফতার করে এবং জিজ্ঞাসাবাদে সে সিরিয়াল অনুযায়ী ছয়টি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে। পরদিন ১৯ জানুয়ারি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলে আদালত তা গ্রহণ করে তাকে কারাগারে পাঠায়।যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, সাইকো সম্রাট নামে পরিচিত এই ব্যক্তির আসল নাম সবুজ শেখ। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং থানার হলুদিয়া ইউনিয়নের মোছামান্দা গ্রামে এবং তার বাবার নাম পান্না শেখ।পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে আসে, ২০১৪ সালে সাভারের তেঁতুলঝরা ইউনিয়নে প্রথম হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে অপরাধজগতে তার প্রবেশ। ওই ঘটনায় গ্রেফতার হয়ে চার্জশিটভুক্ত হলেও পরে জামিনে বের হয়ে ২০১৯ সালে তিন মাসের মধ্যে দুইবার মাদক মামলায় গ্রেফতার হয় এবং পুনরায় জামিনে এসে এরপর ভবঘুরে জীবনযাপন করতে করতে সাভার পৌর এলাকায় অবস্থান করে ধারাবাহিকভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটাতে থাকে। তার বিরুদ্ধে মোট সাতটি হত্যা ও দুটি মাদক মামলা বিচারাধীন ছিল।পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ জুলাই সাভার মডেল মসজিদের সামনে আসমা বেগম নামে এক বৃদ্ধাকে শ্বাসরোধে হত্যা, ২৯ আগস্ট পৌর কমিউনিটি সেন্টারের পরিত্যক্ত ভবনে এক যুবককে হত্যা করে মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা, ১১ অক্টোবর একই স্থানে আরেক নারীকে হত্যা, ১৯ ডিসেম্বর আরও এক যুবককে হত্যা এবং ১৭ জানুয়ারি গভীর রাতে এক নারীসহ দুইজনকে হত্যা করে মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা স্বীকার করে সে। এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ছিল তানিয়া আক্তারের ঘটনা, যার পরিচয় উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে আগের দিনের ধারণ করা একটি ভিডিও ফুটেজ। পরিত্যক্ত ভবনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই মরদেহ প্রথমে ছিল অজ্ঞাত। তদন্তের একপর্যায়ে উদ্ধার হওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সম্রাট নিজ কাঁধে করে এক নারীর নিথর দেহ দ্বিতীয় তলায় নিয়ে যাচ্ছে এবং আগুনে পোড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।সাভার মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) মো. হেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে এসআই সাখাওয়াত ইমতিয়াজ, এসআই ফাইজুর খান এবং পুলিশ সদস্য মনির হোসেনের সহায়তায় মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যেই তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন আদালতে স্বীকারোক্তি দেওয়ার পর তখনো অজ্ঞাত ছিল সেই নারীর পরিচয়।ঘটনার এক দিন আগে ধারণ করা ভিডিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রাজধানীর উত্তরখানের একটি ভাড়া বাসায় বসে মা জুলেখা বেগম তার নিখোঁজ মেয়ে তানিয়া আক্তারকে চিনে ফেলেন। তিনি এর আগে ১ জানুয়ারি নিখোঁজ হওয়ার পর উত্তরখান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন।ভিডিও দেখে ১৯ জানুয়ারি রাতে পরিবার সাভার মডেল থানায় এসে মরদেহ শনাক্ত করে এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে জন্মদাগ দেখে নিশ্চিত হয় এটি তানিয়া।সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০ জানুয়ারি বিকাল সাড়ে ৩টায় মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। উত্তরখানের বড়বাগ জামে মসজিদে জানাজা শেষে দক্ষিণখানের আজিমপুর গণকবরস্থানে বাবার কবরের পাশে তানিয়াকে দাফন করা হয়।পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তানিয়া ছিলেন তৃতীয়; একটি সাধারণ পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দিয়ে শেষ হয় তার জীবন। তানিয়ার বোন নাসরিন আক্তার ফারিয়া তখন বলেছিলেন ভিডিও ও পুলিশের পেশাদার তদন্ত না হলে হয়তো কখনোই তারা জানতে পারতেন না তাদের বোনের শেষ পরিণতি কী হয়েছে; অন্তত পরিচয়সহ দাফনের সুযোগ পেয়েছেন সেটাই তাদের বড় সান্ত্বনা এবং খুনির কঠোর শাস্তির দাবি করেছিলেন তারা।সোমবার সেই খুনি সাইকো সম্রাটের মৃত্যুর সংবাদ শুনে তানিয়ার মা জুলেখা বেগম ও বোন নাসরিন আক্তার ফারিয়া সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। সাভারের মানুষের কাছে সাইকো সম্রাট ছিল আতঙ্কের আরেক নাম। পরিত্যক্ত ভবনের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা তার নৃশংসতা যেন আবারও মনে করিয়ে দেয় অপরাধ যত গভীরই হোক সত্য একদিন সামনে আসেই; আর আইনের হাত কিংবা সৃষ্টিকর্তার বিচার থেকে কেউ শেষ পর্যন্ত রেহাই পায় না।এ ব্যাপারে সাভার মডেল থানার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরাফাত ইসলাম যুগান্তকে জানান, সম্রাটের মৃত্যুতে তাকে সব মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। তবে পুলিশি তদন্তে আর কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা চলমান থাকবে।এনআই

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
দেশজুড়ে বজ্রসহ বৃষ্টির আভাস
দেশজুড়ে বজ্রসহ বৃষ্টির আভাস

দেশের সব বিভাগে আগামী ২৪ ঘণ্টায় বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর মধ্যে কোথাও কোথাও ভারি বর্ষণের আশঙ্কাও রয়েছে। শুক্রবার (১০ অক্টোবর) Read more

বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর স্টেডিয়ামের তালিকায় সিলেট
বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর স্টেডিয়ামের তালিকায় সিলেট

বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর সাতটি ক্রিকেট স্টেডিয়ামের তালিকা তৈরি করেছে ক্রিকেট ৩৬৫। ইংল্যান্ডের ক্রিকেটভিত্তিক গণমধ্যমের সেই সংক্ষিপ্ত তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে Read more

বাংলাদেশি‌দের জন্য অভিবাসী ভিসা স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র
বাংলাদেশি‌দের জন্য অভিবাসী ভিসা স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা দেয়া স্থগিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সরকারি কল্যাণ সুবিধা ব্যবহারের হার বাংলাদেশিদের মাঝে বেশি হওয়ার কারণে এ Read more

চট্টগ্রাম-১৫ আসনে আলোচনায় এনসিপির জুবাইর আরিফ
চট্টগ্রাম-১৫ আসনে আলোচনায় এনসিপির জুবাইর আরিফ

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশের ২৩৭টি আসনে প্রাথমিক তালিকা ঘোষণা করেছে বিএনপি। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ১৬টি Read more

বাঘাইছড়িতে মৎস্যজীবীদের মাঝে ছাগল বিতরণ
বাঘাইছড়িতে মৎস্যজীবীদের মাঝে ছাগল বিতরণ

রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিকল্প আয়বর্ধক কর্মসূচির অধীনে ২০২৪-২০২৫ অর্থ বছরের নিবন্ধিত মৎসজীবীদের মাঝে উপকরণ Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন