শুরু হয়েছে সুন্দরবনের দুবলার চরের শুঁটকি তৈরির মৌসুম। শুঁটকি পল্লীতে ফের শুরু হবে কর্মব্যস্ততা। জীবনের ঝুঁকি ও ঋণের বোঝা নিয়ে মৎস্য আহরণে সমুদ্রে যাত্রা করছে জেলেরা। জেলেরা সমুদ্রে মৎস্য আহরণকে ঘিরে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছে। ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলেছে উপকূলের জেলে-মহাজনেরা।সাগরে যেতে যে যার মত প্রস্তুত করেছেন জাল, দড়ি, নৌকা-ট্রলার। কেউ কেউ গড়েছেন নতুন ট্রলার, আবার কেউ পুরাতন নৌকা মেরামত করে নিয়েছেন। আবার অনেকে চড়াহারে মহাজনদের সুদের মাশুল গুণে এ পেশায় টিকে থাকার জন্য কঠোর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রস্তুতি অনুযায়ী অনেকেই আগেভাগে রওনা দিচ্ছেন। অনেকেই আবার সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে ইতোমধ্যে চলে এসেছে মোংলা নদীর পাড়ে।শুক্রবার (২৫ অক্টোবর) রাত ১২টার পরপরই দুবলার চরের উদ্দেশে রওনা হয়ে যাবেন জেলেরা। আগামী ৫ মাস তারা সেখানে থাকবেন। তৈরি করবেন বিভিন্ন জাতের মাছের শুঁটকি। দুবলার চর বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের দক্ষিণে, কটকার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং হিরণ পয়েন্টের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত একটি দ্বীপ, যা চর নামে হিন্দুধর্মের পূণ্যস্নান, রাসমেলা এবং হরিণের জন্য বহুল পরিচিত। কুঙ্গা ও মরা পশুর নদের মাঝে এটি একটি বিচ্ছিন্ন চর। এই চরের মোট আয়তন প্রায় ৮১ বর্গমাইল। আলোরকোল, হলদিখালি, কবরখালি, মাঝেরকিল্লা, অফিসকিল্লা, নারকেলবাড়িয়া, ছোট আমবাড়িয়া এবং মেহের আলির চর নিয়ে দুবলার চর গঠিত।দুবলার চরে তৈরি হয় জেলে গ্রাম। মাছ ধরার সঙ্গে চলে শুঁটকি শুকানোর কাজ। বর্ষা মৌসুমের ইলিশ শিকারের পর বহু জেলে পাঁচ/সাড়ে পাঁচ মাসের জন্য সুদূর কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ, বাগেরহাট, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা থেকে ডেরা বেঁধে সাময়িক বসতি গড়ে সেখানে। মেহেরআলীর খাল, আলোরকোল, মাঝেরচর, অফিসকেল্লা, নারিকেলবাড়িয়া, মানিকখালী, ছাফরাখালী ও শ্যালারচর ইত্যাদি এলাকায় জেলে পল্লী স্থাপিত হয়। এই ক’মাস তারা মাছকে শুঁটকি বানাতে ব্যস্ত থাকেন। এখান থেকে শুঁটকি পাইকারী বাজারে মজুদ ও বিক্রি করা হয়।সুন্দরবনের পূর্ব বিভাগ থেকে মাছ সংগ্রহের অনুমতি সাপেক্ষে বহরদার ও জেলেরা দুবলার চরে প্রবেশ করে থাকেন। দুবলার চর থেকে সরকার নিয়মিত হারে রাজস্ব পেয়ে থাকে। প্রতি বছর বিএলসি বা বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট, ডিএফসি বা ডেইলি ফুয়েল (জ্বালানি কাঠ) কনসাম্পশন ইত্যাদি প্রক্রিয়ায় বন বিভাগকে রাজস্ব প্রদান করে মৎস্য ব্যবসায়ীগণ সুন্দরবনে ঢোকার অনুমতি পান। এছাড়া আহরিত শুঁটকি মাছ পরিমাপ করে নিয়ে ফিরে আসার সময় মাছভেদে প্রদান করেন নির্ধারিত রাজস্ব।শুধুমাত্র সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে ও নানা প্রতিকূলতায় ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে পারেনি জেলে পরিবারগুলো। বরং দিন দিন তাদের অবস্থার অবনতি ঘটেছে। ক্রমবর্ধমান ক্ষতির মুখে ইতোমধ্যে পুঁজি ও জাল-নৌকা হারিয়ে পেশা হারিয়েছেন অনেকে। জেলেরা বলছেন মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নিচ্ছেন সুদের কারবারিদের কাছ থেকে। কেউবা টাকা গ্রহণে এনজিও, বিভিন্ন ব্যাংক ও সমিতি থেকে ঋণ করছেন। ঋণ, সুদের বোঝার সঙ্গে এমন দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়েই ৫ মাসের এক অনিশ্চিত জীবন শুরু করতে চলেছেন তারা।ডুমুরিয়া এলাকার বহদ্দার রবিন বিশ্বাস বলেন, প্রতি বছর আমরা বিভিন্নভাবে ঋণ করে সমুদ্রে যাই। এবছরও পাঁচ লক্ষ টাকা ঋণ করেই সাগরে যাচ্ছি। সরকারিভাবে আমরা তেমন কোন সাহায্য সহযোগিতা পাই না। তিনি বলেন, সুন্দরবনে জলদস্যু-বনদস্যুর উৎপাত ও মুক্তিপণ আদায়সহ আসাধু বনরক্ষীদের দৌরাত্ম্য দীর্ঘ দিন বন্ধ ছিলো। তবে শুনেছি এখন জলদস্যু-বনদস্যুর উৎপাত নাকি আবার বেড়েছে।কড়াইদিয়া এলাকার জেলে দ্বীপক মল্লিক বলেন, বনবিভাগের পাস নিয়েই আমরা রওনা হই সাগর পাড়ের দুবলার চরে। ধার দেনা করেই আমাদের যেতে হয় সাগরে। তবে অনেকে এবার সুদে টাকা দিতে রাজি না হওয়ায় স্বর্ণের জিনিস রেখে টাকা আনতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন সাগরে দস্যুদের উৎপাত না থাকলেও এবার নাকি দস্যুদের দেখা যাচ্ছে। ঝড়-জলোচ্ছাসের প্রাণহানী ও ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি মাথায় নিয়েই দুবলায় যাত্রা শুরু করি আমরা হাজার হাজার জেলে।জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির মোংলা শাখার সভাপতি বিদ্যুৎ মন্ডল বলেন, পাস পারমিট হাতে পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পর সকল জেলেরা দুবলার চরের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। তারা এখান থেকে সব ধরনের সরঞ্জাম নিয়েই যাবেন।পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নূরুল করিম বলেন, বনবিভাগের কাছ থেকে পাস (অনুমতিপত্র) নিয়ে নিজ নিজ এলাকা থেকে রওনা হয়ে জেলেদেরকে সরাসরি যেতে হবে দুবলার চরে। চরে ঘর বাড়ি বা দোকান পাট তৈরী করার জন্য কোন সুন্দরবনের কোন গাছ কাটতে পারবে না।তিনি আরো বলেন, গত শুঁটকির মৌসুমে দুবলার চর থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছিল সাড়ে ৬ কোটির মত। এবারও আমাদের আশা আছে সাড়ে ৬ থেকে ৭ কোটি টাকার মত রাজস্ব আদায়ের।এসআর

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে টানা বৃষ্টিতে দুর্যোগ, ভূমিধসে প্রাণহানি
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে টানা বৃষ্টিতে দুর্যোগ, ভূমিধসে প্রাণহানি

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে টানা বর্ষণ ও ঝড়ো হাওয়ায় ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত দুই দিনে ৫৩টি Read more

এবার সাংবাদিক হত্যার অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা
এবার সাংবাদিক হত্যার অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে আব্দুন নূর নামে এক সাংবাদিক নিহতের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৬২ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে।মামলাটি Read more

চকরিয়ায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক ধর্ষণ মামলার আসামি গ্রেফতার
চকরিয়ায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক ধর্ষণ মামলার আসামি গ্রেফতার

কক্সবাজারের চকরিয়ায় পুলিশের বিশেষ অভিযানে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় নুরুল আমিন প্রকাশ পুতিয়া নামে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক Read more

ইসরায়েলি হামলায় আরও ১১৬ ফিলিস্তিনির মৃত্যু
ইসরায়েলি হামলায় আরও ১১৬ ফিলিস্তিনির মৃত্যু

ইসরায়েলের মানবিক সহায়তা বন্ধ ও অবরোধের মধ্যেই ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় অনাহারে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ৩৫ দিন বয়সী ওই Read more

শতাধিক নৌকার মিছিল নিয়ে দখলকৃত জলমহাল উন্মুক্ত করলো জেলেরা
শতাধিক নৌকার মিছিল নিয়ে দখলকৃত জলমহাল উন্মুক্ত করলো জেলেরা

শতাধিক নৌকা নিয়ে মিছিল করে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে অবৈধভাবে দখল করে রাখা একটি জলমহাল উন্মুক্ত করে নিয়েছে স্থানীয় জেলেরা। রবিবার (২৬ অক্টোবর) Read more

ভোটের মাঠে আগে-পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকবে ৭ দিন
ভোটের মাঠে আগে-পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকবে ৭ দিন

আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ঘিরে এবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হবে ৭ দিনের জন্য। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন