দেশের সর্ববৃহৎ বেনাপোল বন্দরে ‘নো এন্ট্রি ও ঘোষনা বহির্ভূত’ ভুয়া মেনিফেস্টের মালামাল আমদানি বন্ধ হচ্ছে না। বারবার কোটি কোটি টাকার অবৈধ মালামাল জব্দ হলেও চক্রের মূলহোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। কাস্টমস কর্তাদের যেন কোনো মাথাব্যাথা নেই। এতে প্রশ্ন উঠেছে, কারা এই সিন্ডিকেটের পেছনে থেকে সব নিয়ন্ত্রণ করছে?সর্বশেষ গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ভারত থেকে আমদানি পণ্য নিয়ে আসা একটি কাভার্ড ভ্যান (এইচ আর ৩৮ ইউ ২৪৮২) আটক করা হয়। ভারতীয় কাভার্ডভ্যানটি বেনাপোল স্থল বন্দরের কার্গো ইয়ার্ডে প্রবেশ করে। এরপর স্কেল হয়ে কার্গো ইয়ার্ডের মধ্যে এসে গাড়িটির হেলপার এবং চালক দ্রুত নিজ দেশে চলে যায়। এরপর গাড়িটি বন্দরের দায়িত্বে থাকা বেসরকারি সংস্থা পিমার নিরাপত্তা কর্মীরা পাহারা দিচ্ছে। আটককৃত কাভার্ডভানে কী আছে সেটি কাস্টমস কর্তৃপক্ষ দেখেননি। পরবর্তীতে কাস্টমস হাউসের তত্ত্বাবধায়নে ট্রাকটি সিলগালা করে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে ট্রাকটি বেনাপোল কার্গো ভেহিক্যাল টার্মিনালে পাহারায় রয়েছে। কাস্টমসের রহস্যজনক এই ভূমিকার কারণে বেনাপোল বন্দরে ব্যবসায়ীদের মাঝে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে।বন্দরের দায়িত্বে থাকা বেসরকারি সংস্থা পিমার নিরাপত্তা কর্মীরা জানান, ভারতীয় কাভার্ডভ্যানটি কারা আটক করেছে এবং এই গাড়িতে কাদের মালামাল রয়েছে আমরা জানি না। আমাদের বন্দরের স্যাররা গাড়িটি পাহারা দিতে বলেছে। শুনেছি গাড়ির চালক ও হেলপার গাড়ি রেখে ইন্ডিয়ায় পালিয়ে গেছে।তবে গোপন সূত্রে জানা গেছে, ট্রাকটিতে ভারত থেকে বডি স্প্রের আড়ালে উচ্চ শুল্কযুক্ত উন্নতমানের ফেব্রিক্সের চালান বাংলাদেশে আনা হচ্ছিল। যে কারণে বেনাপোল কার্গো ভেহিক্যাল টার্মিনালে ট্রাক রেখে ড্রাইভার পালিয়ে যায়। এ পণ্য চালানের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ছিল রাইচ ট্রেডিং ইন্টারন্যশনাল এবং রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ছিল বিলিসিভ কসমেটিক্স লিমিটেড।বন্দরের একটি সূত্র জানায়, চোরাচালানী ও পাচারকারী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ভারতীয় ট্রাকের আমদানিকৃত পণ্যের সাথে আসে বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পণ্য এভাবে ভারত থেকে পাচার করে আনা হচ্ছে। এই চক্রের দৌরাত্মের কারণে সরকার কোটি কোটি টাকা শুল্ক হারাচ্ছে। শুল্ক ফাঁকি দিয়ে পণ্য নিয়ে আসার কারণে বেনাপোল কাস্টমস হাউজ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে।স্থানীয় ব্যবসায়ী মহল বলছে, প্রতিবারই কিছু ট্রাকচালক বা বাহক ধরা পড়ছে, কিন্তু পেছনের শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কোনো সদস্য গ্রেফতার হচ্ছে না। এছাড়াও বেনাপোল বন্দর ও কাস্টমস হাউসের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহায়তায় স্থানীয় একটি চোরাচালান চক্র কোটি কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আসছে। তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নিলে ভুয়া মেনিফেস্ট আর নো-এন্ট্রি পণ্য আমদানি বন্ধ হবে না।বেনাপোল সিএন্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মফিজুর রহমান স্বজন জানিয়েছেন, বেনাপোল অবৈধ পণ্য আটক তৎপরতায় দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের গাফিলতি এখানে দৃশ্যমান। উন্নত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রশাসন দ্বারা বেনাপোল বন্দর পরিচালনা করা না গেলে, এ ধরনের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি চলতে থাকবে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আমদানিকারক বলেন, প্রায়ই ভূয়া মেনিফেস্ট ও নো-এন্ট্রি পণ্য আটক হচ্ছে। এতে বৈধ ব্যবসায়ীরা বারবার সমস্যায় পড়ছেন। ইতোপূর্বে ভূয়া মেনিফেস্টের মাধ্যমে তারা ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে, যার প্রমাণ সম্প্রতি দুটি অবৈধ পণ্য চালান আটক হওয়ার ঘটনায় মিলেছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এর প্রতিবাদ জানিয়ে আসছি, কিন্তু বেনাপোল বন্দর ও কাস্টমসের কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ায় এই অবস্থা দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। অবিলম্বে এর বিরুদ্ধে নজরদারি বাড়িয়ে দোষীদের আইনের আওতায় না আনলে আমদানি-রপ্তানির সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে।বেনাপোল স্থলবন্দর পরিচালক শামীম হোসেন বলেন, আমি গোপন একটি তথ্যের ভিত্তিতে গাড়িটি মঙ্গলবার রাতে আটক করি। গাড়িটি দেখার জন্য কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি। গাড়ি আটকের সময় দ্রুত ওই গাড়ির চালক ও হেলপার ভারতে পালিয়ে যায়। তবে এখনো গাড়িটি আমাদের তত্ত্বাবধায়নে আছে। গাড়িটি পণ্য যাচাই-বাছাই কখন হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা কাস্টমসের বিষয়। তারা যখন চাইবে তখন যাচাই-বাছাই করবে কী পণ্য আছে।তিনি আরো বলেন, নানা অনিয়মের ঘটনায় বন্দর সংশ্লিষ্ট ১৫ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। যদি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হাতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বন্দরে প্রতিটি ঘটনায় আমাদের নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে মালামাল তল্লাশি ও সন্দেহভাজন চিহ্নিত করার কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। আমরা শুধু আটক অভিযানে সীমাবদ্ধ থাকছি না, মূলহোতাদের ধরার জন্য সিসিটিভি মনিটরিং, রিস্ক প্রোফাইলিং ও সমন্বিত টিম কার্যক্রমে মনোযোগ দিচ্ছি। তবে সিন্ডিকেটের জটিলতার কারণে কিছু ঘটনা আমাদের চোখের আড়াল হতে পারে।এর আগে গত ২২ সেপ্টেম্বর রাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বন্দরের বাইপাস সড়কে অভিযান চালিয়ে প্রায় আড়াই কোটি টাকার ভারতীয় শাড়ি, থ্রিপিস, কসমেটিকস, ওষুধ ও মোটরসাইকেলের টায়ার আটক করেন। এ ঘটনায় দুইজনকে আটক করা হলেও মূল কারবারীদের এখনো চিহ্নিত করা যায়নি।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
