বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের অবিসংবাদিত কিংবদন্তি, পপগুরু হিসেবে খ্যাত আজম খান নেই আমাদের মাঝে দীর্ঘ ১৪ বছর। ২০১১ সালের ৫ জুন, ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান মুক্তিযোদ্ধা ও বহু গুণের অধিকারী কিংবদন্তি এই সংগীত তারকা।আজম খান ১৯৫০ সালে ঢাকার আজিমপুরে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে তাঁর ছেলেবেলা কাটে আজিমপুরের ১০ নম্বর সরকারি কোয়ার্টারে। ১৯৫৫ সালে তিনি প্রথমে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী স্কুলে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে তাঁর বাবা কমলাপুরে বাড়ি বানান। এরপর থেকে সেখানে বসতি তাঁদের। সেখানে তিনি কমলাপুরের প্রভেনশিয়াল স্কুলে প্রাথমিক স্তরে এসে ভর্তি হন। তারপর ১৯৬৫ সালে সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭০ সালে টি অ্যান্ড টি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। মুক্তিযুদ্ধের পর পড়ালেখায় আর অগ্রসর হতে পারেননি।মাত্র ২১ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন আজম খান। ওই সময় প্রশিক্ষণ শিবিরে তার গাওয়া গানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জোগাতো। প্রশিক্ষণ শিবিরে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার পর তিনি কুমিল্লার সালদায় প্রথম সরাসরি যুদ্ধ করেন। যুদ্ধে দুই নম্বর সেক্টরের একটা সেকশনের ইনচার্জ ছিলেন তিনি। এসময় ঢাকা ও এর আশপাশে বেশ কয়েকটি গেরিলা আক্রমণেও অংশ নেন আজম খান। বিশেষত যাত্রাবাড়ী-গুলশান এলাকার গেরিলা অপারেশনগুলো পরিচালনার দায়িত্ব পান তিনি। তার নেতৃত্বে সংঘটিত হয় ‘অপারেশন তিতাস’। ১৯৭১ সালের পর তার ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ এবং আখন্দ ভ্রাতৃদ্বয় (লাকী আখন্দ ও হ্যাপী আখন্দ) দেশব্যাপী সঙ্গীতের জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বন্ধু নিলু আর মনসুর গিটারে, সাদেক ড্রামে, নিজেকে প্রধান ভোকাল করে করলেন এক অনুষ্ঠান।১৯৭২ সালে বিটিভিতে ‘এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ ও ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দুটি সরাসরি প্রচার হয়। ব্যাপক প্রশংসা ও তুমুল জনপ্রিয়তা এনে দিল এ গান দুটি। দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়ে গেল তাদের দল। ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘রেললাইনের ঐ বস্তিতে’ শিরোনামের গান গেয়ে হইচই ফেলে দেন। আজম খান ক্রিকেটারও ছিলেন। ১৯৯১—২০০০ সালে তিনি গোপীবাগ ফ্রেন্ডস ক্লাবের পক্ষ হয়ে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলতেন। তিনি ভালো সাঁতারুও ছিলেন এবং নতুন সাঁতারুদেরকে মোশারফ হোসেন জাতীয় সুইমিং পুলে সপ্তাহে ৬ দিন সাঁতার শিখাতেন। এছাড়া ১৯৮৬ সালে ‘কালা বাউল’ নামে একটি নাটকে কালা বাউলের চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ‘গডফাদার’ নামক একটি বাংলা সিনেমায় খল চরিত্রে অভিনয় করেন ২০০৩ সালে। বিজ্ঞাপন জগতে তিনি পদার্পণ করেন একই বছরে একটি এনার্জি ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে আরও অনেক বিজ্ঞাপনে কাজ করেন তিনি।দেশজ লোকসঙ্গীত, পল্লীগীতি, আধুনিক অথবা সমাজ সচেতন গানের সঙ্গে পপ শৈলীর মিশ্রণ দিয়ে গানের এক বিরাট সম্ভার রেখে গিয়েছেন তিনি। আজম খান ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার ও গায়ক। তার পপ আঙ্গিকের সঙ্গীত বাংলাদেশের যুব সমাজের কাছে পেয়েছে বিপুল সমাদর।‘এক যুগ’ নামে তাঁর প্রথম অডিও এলবাম ক্যাসেট প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। ১৭টি একক, ডুয়েট ও মিশ্রসহ সব মিলিয়ে তাঁর গানের অ্যালবাম ২৫টি। তাঁর প্রথম সিডি বের হয় ১৯৯৯ সালের ৩মে ডিস্কো রেকর্ডিংয়ের প্রযোজনায়। আজমের উল্লেখযোগ্য অ্যালবামের মধ্যে আছে দিদি মা, বাংলাদেশ, কেউ নাই আমার, অনামিকা, কিছু চাওয়া, নীল নয়নতা ইত্যাদি। মৃত্যুর পর আগস্ট ১১, ২০১১ সালে ইম্প্রেস অডিও ভিশনের ব্যানারে ‘গুরু তোমায় সালাম’ নামে তার সর্বশেষ এলবাম প্রকাশিত হয়বাংলাদেশেই নয়, উপমহাদেশেও তিনি পেয়েছেন ব্যাপক জনপ্রিয়তা। তার বর্ণাঢ্য সঙ্গীত জীবনে হলিউড থেকে ডিসকো রেকর্ডিংয়ের সৌজন্যে ১৯৯৩ সালে ‘বেস্ট পপ সিঙ্গার অ্যাওয়ার্ড’, ‘টেলিভিশন দর্শক পুরস্কার ২০০২’, ‘কোকাকোলা গোল্ড বটল’সহ ‘লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ পুরস্কার পেয়েছেন।আজম খানের মায়ের নাম ছিল জোবেদা খাতুন। তাঁর বাবা মোহাম্মদ আফতাবউদ্দিন খান তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যক্তিগতভাবে হোমিওপ্যাথির চিকিৎসক ছিলেন। আজমের তিন ভাই ও এক বোন ছিল। বড় ভাই সাইদ খান (সরকারি চাকরিজীবী), মেজো ভাই বাংলা চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক আলম খান; আলম খানের তত্ত্বাবধানে আজম খানের প্রথম গান রেকর্ডিং হয়েছিল। ছোট ভাই লিয়াকত আলী খান (মুক্তিযোদ্ধা) এবং ছোট বোন শামীমা আক্তার খানম। ১৯৮১ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকার মাদারটেকে তিনি সাহেদা বেগমকে বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় এক ছেলে এবং দুই মেয়ে। প্রথম সন্তানের নাম ইমা খান, দ্বিতীয় সন্তান হৃদয় খান এবং তৃতীয় সন্তান অরণী খান। স্ত্রী সাহেদা বেগমর সাথে সেপারেশনের পর থেকে একাকী জীবনযাপন করেন তিনি।এক বছরেরও বেশি সময় ধরে দুরারোগ্য ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে ২০১১ সালের ৫ জুন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলা পপ সঙ্গীতের এক পথপ্রদর্শক আজম খান।এইচএ

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
বান্দরবানের রুমায় সেনা অভিযানে কেএনএ কমান্ডারসহ নিহত ২
বান্দরবানের রুমায় সেনা অভিযানে কেএনএ কমান্ডারসহ নিহত ২

বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ে সেনাবাহিনীর অভিযানে কুকি চিন ন্যাশনাল আর্মির (কেএনএ) কমান্ডারসহ দুই সদস্য নিহত হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (৩ জুলাই) Read more

ভাঙ্গুড়ায় ‘ভোরের ফুটবল’ বদলাচ্ছে সমাজ
ভাঙ্গুড়ায় ‘ভোরের ফুটবল’ বদলাচ্ছে সমাজ

পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলায় সকাল বেলায় ফুটবল খেলা বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। স্থানীয়রা দলবদ্ধভাবে সকালে ফুটবল খেলে সময় কাটান এবং শরীরচর্চা Read more

নেত্রকোনায় পালিত হচ্ছে দিনরাত ব্যাপি খনার মেলা
নেত্রকোনায় পালিত হচ্ছে দিনরাত ব্যাপি খনার মেলা

নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় মঙ্গলঘর পরিসরের আয়োজনে ২য় বছরের ন্যায় পালিত হচ্ছে দিনরাত ব্যাপি খনার মেলা।রবিবার(১৩ এপ্রিল) সকালে জেলার কেন্দুয়া উপজেলার দলপা Read more

গায়ক নোবেলের সঙ্গে ইডেনের সেই ছাত্রীর বিয়ের নির্দেশ
গায়ক নোবেলের সঙ্গে ইডেনের সেই ছাত্রীর বিয়ের নির্দেশ

কারাগারে গিয়েও শেষরক্ষা হলো না। অবশেষে মামলার বাদী ইডেন মহিলা কলেজের সাবেক সেই ছাত্রীকে বিয়ে করতে হচ্ছে গায়ক মাইনুল আহসান Read more

বানিয়াচংয়ে বাছাই করে ‘পুলিশ হত্যা’, কী ঘটেছিল?
বানিয়াচংয়ে বাছাই করে ‘পুলিশ হত্যা’, কী ঘটেছিল?

দিনভর আলাপ আলোচনার পর গভীর রাতে পুলিশ সদস্যদের থানার ভেতর থেকে উদ্ধারের সময় এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে বাছাই করে ছিনিয়ে নিয়ে Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন