দীর্ঘ এক দশকের অবকাঠামো নির্মান ও কারিগরি ধাপ এবং কমিশনিং লাইসেন্স প্রাপ্তির পর রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুল্লিতে জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু করলো রুপপুর প্রকল্পটি। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশের তালিকায় বিশ্বের ৩৩তম দেশ হলো বাংলাদেশ। মঙ্গলবার(২৮ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে নানা সতর্কতা ও সর্বোচ্চ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে এ জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। বহুল প্রতিক্ষিত সেই রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের এ অভিভাষণ যাত্রাতে ব্যাপক আনন্দ ও উচ্ছাসিত হতে দেখা গেছে স্থানীয় মানুষসহ পুরো ঈশ্বরদীবাসীকে। প্রকল্পটি নির্মানকালীন সূচনা থেকে এ পর্যন্ত স্থানীয় জীবনমান উন্নয়নে যেমন সহায়ক ভূমিকা রেখেছে তেমনই শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও রেখেছে ইতিবাচক প্রভাব।বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আগে এটি চূড়ান্ত ধাপ। ধাপে ধাপে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং এর পর প্রথম ইউনিট থেকে আগামী জুলাই-আগস্টে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।এদিকে নির্মানাধীন রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জীবনমান উন্নয়নে যে পরিবর্তন এসেছে তা কেবল শুধু পরিবর্তনই নয়, বরং এটি ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম ভিত্তিস্তম্ভ। গত এক দশক আগে ঈশ্বরদীর জনপদে যে নিম্ন চিত্র ছিল তা শতভাগ পাল্টে গিয়ে উন্নয়নের ছোঁয়াতে পরিনত হয়েছে উচ্চ জনপদে। শুধুমাত্র প্রকল্পকে ঘিরেই মফস্বল শহরের অধিকাংশ এলাকায় গড়ে উঠেছে রুপপুর প্রকল্পে কর্মরত রুশ নাগরিকদের বসতি, তৈরি হয়েছে রাশিয়ান পল্লী, আর এসব রুশ নাগরিকদের প্রয়োজনের তাগিতেই গড়ে উঠেছে নানা স্থাপনা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানসহ বেশ কয়েকটি বিনোদন কেন্দ্র। পুরো উপজেলা জুড়ে এসব রুশ নাগরিকদের অবাধ বিচরনে বলাই যায় “ঈশ্বরদী এক টুকরো রাশিয়া”রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যেখানে গবেষনা ও জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। যার কোন অংশেই পিছিয়ে নেই ঈশ্বরদী। রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তথ্য কেন্দ্র আয়োজিত উপজেলার ২২ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একযোগে পরমানু কি, কিভাবে জ্বালানি হয়, প্রকল্পটি পরিবেশের উপর কি ধরনের প্রভাব ফেলতে পরে এমন ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান করে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনে সহায়ক ভুমিকা রেখে চলেছে। এ বিষয়ে ঈশ্বরদী সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যাপক ও সিনিয়র সাংবাদিক স্বপন কুমার কুন্ডু অভিমত জানিয়ে বলেন, রুপপুর প্রকল্প কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রই নয়, এটি দেশের তরুণ প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের রাশিয়ায় এবং স্থানীয়ভাবে উন্নত পারমাণবিক প্রযুক্তির (VVER-1200) ওপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছে যা দেশে পরমাণু প্রকৌশল শিক্ষার নতুন দুয়ার খুলে দিতে সক্ষম হবে।জীবনমান উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি: রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ঘিরে প্রকল্প এলাকার আশেপাশে গড়ে উঠেছে আধুনিক আবাসন ও রাস্তাঘাট যা অনায়াসে জীবনমান উন্নয়নে ব্যাপক ভুমিকা রাখছে। শুধুমাত্র গ্রিনসিটি ও তার আশেপাশে গড়ে উঠা আন্তর্জাতিক মানের খাবার হোটেল ও বিভিন্ন শপিংমল পুরো শহরকে এনে দিয়েছে আভিজাত্যের ছোঁয়া। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সকলেই এখন রুশ ভাষায় অনবরত কথা বলেন প্রকল্পে কর্মরত সকল রুশ নাগরিকদের সঙ্গে। গ্রিনসিটির ঠিক সামনেই গ্রিনসিটি ক্যাফে। যেখানে রাশিয়ার আদলে তৈরি হয় বিভিন্ন আইটেমের খাবার ও চা-কফি। সেখানে কর্মরত মোঃ রিমেল হোসেন বলেন, বিগত পাঁচ বছর ধরে এখানে কাজ করছি। রাশিয়ান নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তাদের চলিত ভাষার পুরোটাই এখন আমার আয়ত্তে। তাদের ভাষাতেই আমরা আমাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করছি।রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি কর্পোরেশন রোসাটম (Rosatom)-এর তত্ত্বাবধানে নির্মিত হচ্ছে। যেখানে প্রকল্পের মূল কারিগরি অবকাঠামো নির্মানে প্রায় আড়াই হাজার রুশ নাগরিক কাজ করছে। এছাড়াও প্রকল্পের অভ্যন্তরে বিভিন্ন কোম্পানির আওতাধীন প্রায় ১৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। বর্তমানে ঈশ্বরদী ও আশেপাশের অঞ্চল এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে যা স্থানীয় অর্থনীতির গতি বাড়াতে সক্ষম হয়েছে।রুপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, ২০১৭ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্প এখন পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে। এক বছরের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি স্থাপনের মাধ্যমে কাজ দ্রুত এগিয়েছে। তিনি জানান, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ যোগ করবে, যা শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে এটি পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি দীর্ঘমেয়াদি উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যার সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল প্রায় এক শতাব্দী। জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের মাধ্যমে রূপপুর প্রকল্প এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিকে এগিয়ে গেল, যা বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
