বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পালপাড়ায় এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন মৃৎশিল্পীরা। নারী-পুরুষ-শিশু—সব বয়সী কারিগরদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হচ্ছে বাহারি মাটির খেলনা ও তৈজসপত্র। সারা বছর তেমন কদর না থাকলেও বৈশাখকে ঘিরে দিন-রাত পরিশ্রমে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা।সোমবার সরেজমিনে পালপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চৈত্রের শেষ সময়ে মাটির তৈরি পণ্যে শেষ মুহূর্তের রং-তুলির আঁচড় দিচ্ছেন কারিগররা। রঙিন নকশা আর নিপুণ কারুকাজে ফুটিয়ে তুলছেন বৈচিত্র্যময় নান্দনিকতা।মাটির পণ্য তৈরির পুরো প্রক্রিয়াই চলছে পুরোদমে—মাঠ থেকে মাটি সংগ্রহ, মাটি প্রস্তুত করা, সাঁচে ঢালাই, রোদে শুকানো, চুলায় পোড়ানো এবং শেষে রং করা। এসব ধাপে ধাপে শ্রমঘন কাজের মধ্য দিয়েই তৈরি হচ্ছে মাটির পুতুল, ফলের প্রতিরূপ, হাতি-ঘোড়া-বাঘ, টিয়া-ময়না-ময়ূর, খরগোশ, হাঁস-মুরগি, মাটির ব্যাংক, চায়ের কাপ, পিঠা তৈরির ছাঁচ, ফুলের টব, হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাটি, কড়াইসহ নানা ধরনের সামগ্রী।এসব পণ্যের বাহারি নকশা আর মাটির নিজস্ব গন্ধ ছড়িয়ে দিচ্ছে বৈশাখের আমেজ। আবহমান গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প একসময় মানুষের নিত্যপ্রয়োজন মিটানোর পাশাপাশি নান্দনিকতারও প্রতীক ছিল। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এই শিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। বছরের অধিকাংশ সময়ই কাজের অভাব থাকলেও উৎসব এলেই প্রাণ ফিরে পায় পালপাড়া।ভাঙ্গুড়া উপজেলার কালিবাড়ী পালপাড়ার মৃৎশিল্পী সাধন চন্দ্র পাল জানান, “এখন মাটির জিনিসের আগের মতো কদর নেই। সারা বছর টানাপোড়েনের মধ্যে সংসার চালাতে হয়। তবে পূর্বপুরুষের পেশার প্রতি ভালোবাসা আর শিকড়ের টানেই এখনো এই কাজ ধরে রেখেছি। বৈশাখকে সামনে রেখে অর্ডার বেড়েছে কয়েকগুণ—এই সময়টাই আমাদের আয়ের বড় ভরসা।”নারী শ্রমিক সোমা রানী পাল বলেন, “বৈশাখ এলেই মেলায় মাটির খেলনা ও সামগ্রীর চাহিদা বাড়ে। এতে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। পুরুষদের পাশাপাশি আমরাও কাজ করি। কাজটা কষ্টের হলেও ভালোবাসা থেকেই করি।”এ বিষয়ে চলনবিল সাহিত্য সংসদের সভাপতি কবি নুরুজ্জামান সবুজ মাস্টার বলেন, “সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ মৃৎশিল্পের উৎকর্ষ দেখিয়েছে। এটি যেমন মানুষের প্রয়োজন মিটিয়েছে, তেমনি নান্দনিকতারও পরিচয় বহন করেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ শিল্পের প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি, নইলে একসময় হারিয়ে যাবে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”পিএম
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
