প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে চলতে পৃথিবীটা ক্যাবল আর স্যাটেলাইটে আবদ্ধ। সেই ধারাবাহিকতায় শহর থেকে গ্রামে পৌঁছে গেছে ইন্টারনেট আর স্মার্টফোন। যখন মোবাইল আসক্তিতে তরুণদের চোখ ঝলসে যাচ্ছে, তখন টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার নলিন বাজারে দাঁড়িয়ে আছে এক ছোট্ট চায়ের দোকান। সেই দোকানের এক কোনায় শোভা পাচ্ছে দেশবরেণ্য লেখকদের বইয়ের সাড়ি। চায়ের সাথে বই পড়ে সময় পার করছেন শিক্ষার্থী থেকে বয়স্করাও।আশেপাশের দোকানে স্মার্ট টেলিভিশন ও ইন্টারনেট থাকলেও এই দোকানে যেন বইই সম্বল। তবুও এই দোকানে নেই খদ্দেরের অভাব। কারণ এখানে চা আসে বইয়ের সঙ্গে, আর গল্প জমে উঠে বইয়ের পাতায়।সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার নলিন বাজারে যমুনার কোল ঘেঁষা একটি ছোট্ট চায়ের দোকানে শিক্ষার্থীসহ নানা বয়সের লোকজন চা খাচ্ছে আর বই পড়ছে। আশেপাশের দোকানে টেলিভিশন থাকলেও ঐ দোকানে নেই। সেখানে বই যেন চা প্রেমিদের সঙ্গী। দূরদূরান্ত থেকে মালাই চা খেতে এসে দোকানের এই চমকপ্রদ আয়োজন দেখে মুগ্ধ হন সবাই। সেই সাথে দোকানের মালিক সুজন মিঞা ভাসছেন প্রশংসায়।দোকানের মালিক সুজন মিঞা তার নিজ ইচ্ছায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা আনজু আনোয়ারা ময়নার সহযোগিতায় তিল তিল গড়ে তুলেন এই ময়না মুক্ত পাঠাগার। উচ্চশিক্ষা না থাকলেও তাঁর চিন্তা-চেতনায় আছে অসাধারণ একটা স্পর্শ।এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ভাগ্যদোষে খুব একটা পড়াশোনা করতে পারিনি। তবে পড়াশোনার গুরুত্ব অপরিসীম, এটা বুঝতে পারি। দিন দিন উঠতি বয়সের ছেলেরা মোবাইল ফোনে আসক্ত হচ্ছে। তাদের চিন্তা শক্তি এবং পড়াশোনার দৈর্ঘ্যও কমে গেছে। তাদের জন্য আমার এই ব্যতিক্রমী আয়োজন। এখানে চা খেতে এসে যদি বইয়ের দুইটা পাতা পড়ে, তবুও কিছুটা ভালো হবে। তাদের বই পড়তে আগ্রহী করতে আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।’দোকানে রাখা আছে হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবাল, কাজী নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মনিষীদের আত্মজীবনীসহ নানা লেখকের বই। চা খেতে খেতে কেউ বইয়ের পৃষ্ঠায় মনোযোগী, কেউ আবার দাঁড়িয়ে পড়েই গল্পে হারিয়ে যায়। দোকানে আসা এক কলেজপড়ুয়া ছাত্র জানায়, ‘আগে এখানে বসে শুধু আড্ডা দিতাম, এখন বই নিয়ে কথা হয়। খুব ভালো লাগে। এর আগে এমন কোথাও দেখিনি। আমি নিয়মিত এখানে চা খেতে আসি এবং বই পড়ি।’এই উদ্যোগ শুধু তরুণদের নয়, এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝেও বইয়ের প্রতি একটা আগ্রহ তৈরি করেছে। দোকানের মালিক সুজন মিঞাকে ধন্যবাদ দিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চায়ের দোকানে পাঠাগার নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় কাজ।’এর আগে এমন কোথাও দেখিনি। বিষয়টি এলাকায় বেশ সাড়া ফেলেছে। চায়ের দোকানে বেশিরভাগ সময় টেলিভিশন দেখে আর খোশগল্প করে, কিন্তু এখানের চিত্রটা একটু আলাদা। এই দোকানে টেলিভিশন নেই। এখানে সবাই চায়ের সাথে বই পড়ে।মুক্তিযোদ্ধা নয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনজু আনোয়ারা ময়না বলেন, ‘তরুণ সমাজ ক্রমেই স্মার্টফোনে আসক্ত হচ্ছে। তারা অধিকাংশ সময় চায়ের দোকানে অহেতুক আলাপ আড্ডায় মশগুল থাকে। তাদেরকে বই পড়তে আগ্রহী করে তুলতে দোকানে চায়ের পাশাপাশি বই রাখার পরামর্শ দিই। পরে দোকানের মালিক সুজন খুব আগ্রহ নিয়ে দোকানের এক কোনায় ময়না মুক্ত পাঠাগার স্থাপন করে।’এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
