কর্ণফুলী নদীর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মাঝিরঘাট সংলগ্ন খালসংযোগস্থলে দখলদারিত্বের এক বেপরোয়া চিত্র সামনে এসেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের একাধিক নির্দেশনা, তদন্ত প্রতিবেদন এবং প্রশাসনিক তাগিদ উপেক্ষা করে মো. ফেরদৌস ইউসুফ এবং তার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান মেসার্স এসএস ট্রেডিং অবৈধ জেটি নির্মাণ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে, এমন অভিযোগে চট্টগ্রামের বন্দরাঞ্চলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।অভিযোগে উঠে এসেছে, মাদারবাড়ি মৌজার মাঝিরঘাট এলাকায় কর্ণফুলী নদী ও সংলগ্ন খালের সংযোগস্থল পরিকল্পিতভাবে দখল ও ভরাট করে সেখানে একটি বিশালাকার স্টিল পন্টুন জেটি নির্মাণ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ওই জেটিতে স্থাপন করা হয়েছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্রেন ও কনভেয়ার বেল্ট, যার মাধ্যমে নিয়মবহির্ভূতভাবে পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য খালাস ও পরিবহন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফলে খালের স্বাভাবিক জলপ্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়ে পড়েছে এবং ধীরে ধীরে পলি জমে নাব্যতা সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে।এই অনিয়মের বিরুদ্ধে সরব হয়ে অনুমোদিত ঘাট মালিক নেজাম উদ্দিন খান এবং খালের লীজগ্রহীতা মো. সরোয়ার আলম বন্দর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগপত্রে তারা উল্লেখ করেন, লাইসেন্স চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত ১০০ ফুট নদীমুখ দীর্ঘদিন ধরে নিয়ম মেনে ব্যবহার করে আসছেন তারা। কিন্তু পাশ্ববর্তী এলাকায় পূর্বে লাইসেন্সপ্রাপ্ত কাঠের জেটির সুযোগ নিয়ে এসএস ট্রেডিং অতিরিক্ত নদীমুখ দখল করে পশ্চিম দিকে প্রায় ১২০ ফুট বিস্তৃত অবৈধ জেটি নির্মাণ করেছে, যা স্পষ্টতই আইনি সীমা লঙ্ঘনের শামিল।অভিযোগকারীরা আরও জানান, এই জেটি নির্মাণের ফলে মাঝিরঘাট খালের অধিকাংশ মুখ কার্যত রুদ্ধ হয়ে গেছে। এতে লবণবাহী ও অন্যান্য পণ্যবাহী নৌযান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে অনুমোদিত জেটিতে পণ্য খালাসের সময় সৃষ্টি হচ্ছে জাহাজে জাহাজে সংঘর্ষের ঝুঁকি, যা যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ সরেজমিন তদন্ত ও জরিপ পরিচালনা করে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সার্ভেয়ারের প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা প্রতীয়মান হলে তা বোর্ড সভায় উপস্থাপন করা হয়। বোর্ডের সিদ্ধান্তে স্পষ্টভাবে বলা হয়, মো. ফেরদৌস ইউসুফ গং-এর অতিরিক্ত নদীমুখ দখল, ভরাট এবং স্টিল পন্টুন জেটি নির্মাণসহ সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম সম্পূর্ণ অবৈধ, বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।পরবর্তীতে অথরাইজ বিভাগ থেকে প্রেরিত নোটিশে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, তারা নির্ধারিত ইজারাকৃত স্থানে জেটি নির্মাণ না করে প্রায় ৭০ ফুট পশ্চিম দিকে অন্যের ইজারাকৃত জায়গার সম্মুখে স্থাপনা গড়ে তুলেছে। এর ফলে খালের আংশিক মুখ বন্ধ হয়ে পানি প্রবাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে এবং পলি জমে খালের নাব্যতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। পাশাপাশি অবৈধভাবে বার্জের সঙ্গে কনভেয়ার বেল্ট ও ক্রেন সংযুক্ত করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং নদীর তীর ভরাটের বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়।চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল) কমডোর কাওছার রশিদ স্বাক্ষরিত পৃথক পত্রে উল্লেখ করা হয়, বন্দর কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ব্যতিরেকে অতিরিক্ত নদীমুখ ব্যবহারের দায়ে আরোপিত পাঁচ লাখ টাকার জরিমানা ২০২২ সাল থেকে এখনো পরিশোধ করা হয়নি। একই সঙ্গে বকেয়া ভাড়া পরিশোধ এবং অবৈধ স্থাপনা, জেটি, কনভেয়ার বেল্ট, ক্রেনসহ ভরাটকৃত মাটি অপসারণের জন্য কঠোর নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।তবে বিস্ময়কর হলেও সত্য, একাধিক প্রশাসনিক নির্দেশনা ও সতর্কতা জারি সত্ত্বেও অভিযুক্তদের কার্যক্রমে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়নি। বরং অভিযোগ রয়েছে, প্রভাব ও প্রতিপত্তির বলয়ে থেকে তারা আগের মতোই অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।এ প্রসঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের অথরাইজ অফিসার সাদিয়া আফরিন কচি সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, অভিযোগের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রমাণিত হওয়ায় অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, নির্দেশনা অমান্য করলে দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।অন্যদিকে, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান মেসার্স এসএস ট্রেডিংয়ের মালিকপক্ষের কাউকে সরাসরি পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তারা বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছেন। প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল হিসেবে পরিচিত মাশরুর আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, মালিকপক্ষ পরে সময়ের কন্ঠস্বরের প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। তবে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা এবং অপেক্ষার পরও তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
