চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (চট্টগ্রাম ওয়াসা)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে নিয়োগকে ঘিরে মঙ্গলবার গভীর রাতে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় এক বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ নজির হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। রাত ৮টায় জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে শওকত মাহমুদকে এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলেও মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে রাত ১০টার মধ্যেই সেই নিয়োগ বাতিল করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। আকস্মিক এই সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রশাসনিক মহলসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক।প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রেষণ-১ শাখা থেকে উপসচিব মোহাম্মদ নূর-এ আলম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী (চতুর্থ গ্রেড) শওকত মাহমুদকে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে প্রেষণে নিয়োগ প্রদান করা হয়। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়, জনস্বার্থে তাকে বদলিপূর্বক উক্ত পদে নিয়োগের নিমিত্ত সংশ্লিষ্ট বিভাগে তার চাকরি ন্যস্ত করা হলো। এই সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক রীতিনীতি অনুসারে কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করলেও তা স্থায়ী হওয়ার আগেই আকস্মিক মোড় নেয়।রাত ১০টার দিকে একই মন্ত্রণালয়ের প্রেষণ-১ শাখা থেকে উপসচিব মো. রফিকুল হক স্বাক্ষরিত আরেকটি প্রজ্ঞাপনে পূর্বের আদেশটি সম্পূর্ণরূপে বাতিল ঘোষণা করা হয়। এতে বলা হয়, জনস্বার্থে জারিকৃত পূর্বের প্রজ্ঞাপন অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হলো এবং এই আদেশ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এ ধরনের বিপরীতমুখী অবস্থান গ্রহণকে বিশেষজ্ঞ মহল ‘প্রশাসনিক দোদুল্যমানতা’র প্রকট উদাহরণ হিসেবে অভিহিত করছেন।ঘটনাটির প্রতিক্রিয়ায় চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে সময়ের কন্ঠস্বর-কে জানান, তারা রাত ৮টার দিকে প্রজ্ঞাপনটি হাতে পেয়েছিলেন এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতিও গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই বাতিল সংক্রান্ত নির্দেশনা এসে পৌঁছালে পরিস্থিতি একপ্রকার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের ভাষ্যমতে, এই নিয়োগ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশাসনিক ও প্রকৌশল মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। বিশেষত পদমর্যাদাগত অসামঞ্জস্য এবং প্রচলিত প্রশাসনিক ধাপ উপেক্ষার অভিযোগই ছিল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। যেখানে চট্টগ্রাম ওয়াসার বিদ্যমান প্রধান প্রকৌশলী তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তা, সেখানে চতুর্থ গ্রেডের একজন কর্মকর্তাকে সরাসরি এমডি পদে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে অনেকেই প্রশাসনিক বিধিবিধানের পরিপন্থী ও নীতিগতভাবে দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, দেশের কোনো ওয়াসা সংস্থায় প্রধান প্রকৌশলী পদে অধিষ্ঠিত একজন কর্মকর্তাকে সরাসরি অন্য সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দৃষ্টান্ত পূর্বে পরিলক্ষিত হয়নি। এ ধরনের নিয়োগে সাধারণত প্রশাসনিক সিনিয়রিটি, অভিজ্ঞতা, পদমর্যাদা এবং নীতিমালার নির্ধারিত ধাপসমূহ অনুসরণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু আলোচিত ঘটনায় অন্তত দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক স্তর অতিক্রম করে সরাসরি সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে নিয়োগ প্রদানকে তারা ‘অস্বাভাবিক ত্বরান্বিত সিদ্ধান্ত’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।এদিকে, চট্টগ্রাম ওয়াসার এমডি পদটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক অচলাবস্থা ও জল্পনা-কল্পনার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। ২০১১ সালে এই পদ সৃষ্টির পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেন এ কে এম ফজলুল্লাহ, যার পুরো মেয়াদকালজুড়ে নানা বিতর্ক, অভিযোগ ও সমালোচনা জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তার নিয়োগ বাতিল করে অপসারণ করা হলে সংস্থাটি স্থায়ী নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে।এরপর থেকে চট্টগ্রামের স্থানীয় সরকার বিভাগের পরিচালকের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব ন্যস্ত করে সংস্থার কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। দীর্ঘ ১৪ বছর পর গত বছর প্রথমবারের মতো এমডি পদে নিয়োগের লক্ষ্যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও সেটি একাধিকবার সংশোধনের পরও কার্যকর কোনো সমাধান প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে প্রায় দেড় বছর ধরে স্থায়ী নেতৃত্বহীন অবস্থায় সংস্থার নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা জনসেবার মান ও কাঠামোগত সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।মঙ্গলবার রাতের ঘটনাপ্রবাহ সেই দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তাকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিশেষ করে হঠাৎ নিয়োগ প্রদান এবং তা দ্রুত প্রত্যাহারের প্রেক্ষাপটে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার যথার্থতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এ ধরনের অস্থিরতা শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর জনআস্থাকেও নড়বড়ে করে তোলে।সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা, যোগ্যতার মানদণ্ড এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অন্যথায় এ ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করার পাশাপাশি জনস্বার্থকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।পিএম
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
