কনের গায়ে হলুদের আনন্দ শেষ হতে না হতেই বরের মৃত্যুর খবরে স্তব্ধ হয়ে গেছে দুই পরিবার। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের এক শিক্ষার্থীর বিয়ের আগের দিন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন হবু স্বামী, প্রকৌশলী জুলফিকার ইসলাম জিল্লু। তিনি পাবনার ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া ইউনিয়নের নওদাপাড়া গ্রামের আনসারুল মুন্সির ছেলে।জানা গেছে, রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাজুবাঘা ইউনিয়নের বড় ছয়ঘটি গ্রামের কনে, মেডিকেল শিক্ষার্থী অন্তরা খাতুনের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শনিবার (২১ মার্চ) সম্পন্ন হয়। পরদিন রোববার সকালে বরের গায়ে হলুদের আয়োজন ছিল। সেই অনুষ্ঠানের পায়েস রান্নার জন্য নিজেই গাড়ি চালিয়ে দুধ আনতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন জুলফিকার ইসলাম জিল্লু।পরিবার সূত্রে জানা যায়, রোববার সকালে তিনি নিজের প্রাইভেটকারে করে দুধ আনতে বাজারে যাচ্ছিলেন। নাটোর-পাবনা মহাসড়কের গড়মাটি কলোনি রোড এলাকায় পৌঁছালে তার গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায় এবং পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে গাড়িটি দুমড়ে-মুচড়ে যায় এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।দুর্ঘটনার খবর পৌঁছাতেই মুহূর্তে বিয়ের আনন্দ পরিণত হয় শোকের মাতমে। দুই পরিবারে নেমে আসে নীরবতা, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে কান্নার ঢেউ।কনে অন্তরা খাতুন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্টার্ন চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত। তিনি বাঘা উপজেলার চন্ডিপুর বড় ছয়ঘটি গ্রামের মৃত আলাউদ্দিনের মেয়ে। মাত্র দুই বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন তিনি। মা রওশন আরা অন্যের বাড়িতে কাজ করে এবং ভাই সোহেল রানা রাজমিস্ত্রির কাজ করে তার পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে সরকারি মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান অন্তরা। তার সংগ্রামী জীবনের গল্প ২০২২ সালের ১০ এপ্রিল গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে র্যাব-৫সহ বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তি তাকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে।রোববার (২২ মার্চ) অন্তরার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দরজায় তালা ঝুলছে। বিয়ের জন্য সাজানো প্যান্ডেল খুলে নিচ্ছেন ডেকোরেটরের কর্মীরা। ‘বন্ধন ডেকোরেটর’-এর মালিক হৃদয় আহমেদ বলেন, সবকিছু প্রস্তুত ছিল, গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানও সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু বরের মৃত্যুর খবর আসার পর কেউ এই সাজানো আয়োজন সহ্য করতে পারছিল না, তাই খুলে নেওয়া হচ্ছে।অন্তরার চাচি রোজিনা বেগম বলেন, রাতে বরপক্ষের লোকজন এসে মিষ্টিমুখ করিয়ে গেছে। সকালে ক্ষীর খাওয়ানোর প্রস্তুতি চলছিল, তখনই দুর্ঘটনার খবর আসে। মুহূর্তেই সব আনন্দ শেষ হয়ে গেল।প্রতিবেশী সালমা বেগম বলেন, এমন করে একটি বিয়ের আনন্দ শোকে পরিণত হবে, কল্পনাও করিনি। মনে হয়, এটাই ছিল মেয়েটির নিয়তি।অন্তরার চাচা আব্দুর রহিম কথা বলতে গিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তার নীরবতা আর দীর্ঘশ্বাসই যেন পুরো ঘটনার বেদনা প্রকাশ করে।একটি স্বপ্নময় বিয়ের আয়োজন মুহূর্তেই পরিণত হলো এক বেদনাবিধুর স্মৃতিতে। উৎসবের রঙ মুছে গিয়ে চারদিকে এখন শুধুই শোক আর নিস্তব্ধতা।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
