২০১৯ সাল থেকে এক সঙ্গে পড়াশোনা। একই হলে একই রুমে অবস্থান। কাকতালীয় ভাবে এক রুমে থাকতে শুরু করেন চার বন্ধু। আইন বিভাগের শিক্ষার্থী হওয়ায় কৌতূহলবশত কক্ষটির নাম দেয় ‘ল চেম্বার’। একদিন এই রুম থেকে আইনের কারিগর হিসেবে নেতৃত্ব দিবেন এমনটা স্বপ্ন ভুনছিলেন তারা। সম্প্রতি প্রকাশিত বার কাউন্সিল ফলাফলে চূড়ান্তভাবে আইনজীবী হিসেবে উত্তীর্ণ হয়ে প্রমাণ করে দিলেন চার বন্ধু। তারা হলেন— শামীম হোসেন সোহান, আলমগীর হোসেন, আশহাদুল ইসমাম ও মেজবা আলম সরকার। সবাই থাকতেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শহীদ আনাস হলের ২১২ নম্বর কক্ষে।নবীন আইনজীবী শামীম হোসেন সোহান ২০১৭ সালে রাজশাহীর আত্রাই আগ্রনী কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। রাজশাহীর মোহনপুরের বাসিন্দা তিনি। আলমগীর হোসেন ২০১৬ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। সুনামগঞ্জের রংপুর গ্রামের বাসিন্দা তিনি। আশহাদুল ইসমামের বাড়ি চট্টগ্রামের মিরশ্বরাই। তিনি ২০১৬ সালে চট্টগ্রাম সরকারী কমার্স কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। অন্যদিকে মেজবা আলম সরকার রাজশাহীর শহীদ এ.এইচ.এম. কামারুজ্জামান সরকারী ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি পাশ করেন। তার বাড়ি বগুড়া। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে চারজনেই ভর্তি হন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। প্রথমবারেই বাজিত করে দেখিয়েছেন তারা।নবীন আইনজীবী শামীম হোসেন বলেন, ২০১৯ সালে শেখ রাসেল হল চালু হলে (বর্তমান নাম শহীদ আনাস হল) হলের প্রথম আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলাম আমরা। হলের ২১২ নাম্বার রুম আমাদের নামে এটাস্টমেন্ট আসে, একদম নতুন হল এবং আমরা এক রুমে সবাই আইনের (আইন-৩০তম) এবং আমাদের আর এক বন্ধু ছিল মেরাজুল ইসলাম মেরাজ (এইচআরএম ১৭-১৮)। রুমে সবাই আইনের হওয়ায় আমি রুমের নামকরণ করেছি ‘ল চেম্বার’। একই বিভাগের হওয়ার কারণে আমরা যেমন আড্ডা দিয়েছি তেমনি পড়াশোনাও সময়মত করেছি এবং আইনের জটিল বিষয়গুলো গ্রুপ স্টাডির মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেছি। আইনের ছাত্র হিসেবে সর্বপ্রথম সবার মনোযোগ থাকা উচিত অ্যাডভোকেটশীপ সনদের দিকে এবং আমরা চার বন্ধু সেটাই করেছি এবং আলহামদুলিল্লাহ সফল হয়েছি।আরেক নবীন আইনজীবী আলমগীর হোসেন বলেন, আমরা পড়াশোনায় রেগুলারিটি মেইনটেইন করতাম। আইনের অনেক বিষয় ছিল, যা আমাদের নাগালের বাইরে; সেগুলো আমরা বড় ভাইদের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করতাম। এই যাত্রায় যাদের প্রতি আমরা চিরকৃতজ্ঞ— শাহাদাত হোসেন নিশান ভাই, হাসান আল আজাদ ভাই এবং শিথুন ওয়াজিদুর রহমান ভাই।আরেক নবীন আইনজীবী আশহাদুল ইসমাম বলেন, আড্ডা, আনন্দ, বিনোদন পড়ালেখা সব সমানতালে হত। সবকিছুর ফাঁকে পড়ালেখাটা সবসময় ঠিক রাখার চেষ্টা করতাম। এর মধ্যে শামীম ছিলো ডিপার্টমেন্টের ফার্স্ট বয়। তাই রুমে আলাদা একটা পড়ার পরিবেশ থাকতো সবসময়ই। আমাদের মধ্যে হিংসা ছিল না কখনো, কারণ আমরা বাকি ৩ জন ছিলাম ব্যাকবেঞ্চার। মনস্তাত্ত্বিক লড়াই ছিলো না একে অপরের সাথে যার ফলে আমাদের বন্ডিং সুদৃঢ় ছিল। আইনের ছাত্র হিসেবে আমাদের লক্ষ্য ছিলো প্রথমবারেই অ্যাডভোকেশীপের সনদ পাওয়া। সিনিয়ররা উপদেশ দিত প্রথমবারে না হলে পরবর্তীতে হতে কষ্ট হয়ে যায়।চার বন্ধুদের মধ্যে নবীন আইনজীবী মেজবা আলম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর কিছুদিন কুষ্টিয়া শহরে অবস্থান করলেও পরবর্তীতে শেখ রাসেল হলের (শহীদ আনাস হল) ২১২ নং রুমে উঠি। এরপর থেকেই বিভাগের পরে সবথেকে প্রিয় জায়গা হয়ে যায় ২১২নং রুম। আইন বিভাগে ভর্তির পর থেকেই মাঝে মাঝে কোর্টে যাতায়াত করতাম। একজন অ্যাডভোকেটকে দেখে সবসময়ই নিজেকে সেই জায়গায় কল্পনা করতাম। অ্যাডভোকেট হওয়ার সেই জার্নির পিছনে প্রথম উৎসাহ ও সহযোগিতা পেতাম রুমমেটদের থেকে। এ ছাড়া আমরা সিনিয়রদের থেকে দিকনির্দেশনা নিতাম। আবার, বন্ধু বান্ধব বা আত্মীয়স্বজনদের কোনো আইনগত সমস্যা উদ্ভূব হলে আমরা চার বন্ধু একত্রিত হয়ে উৎসাহের সহিত সেটাকে সমাধান করার চেষ্টা করতাম। এছাড়া চার বন্ধু একসাথে থাকার সবচেয়ে বড় সুবিধাটা ছিলো একজন পড়তে বসলে বাকিরা পড়তে বসার আগ্রহ পেত।এমন ফলাফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মাঝে আনন্দ বয়ে চলছে। অনেকে মনে করছেন ‘সৎ স্বর্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’ প্রবাদের সাথে গেছে।উল্লেখ্য, গত ১৫ নভেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর ২০২৫ এবং ১৩ মার্চ থেকে ১৪ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত বার কাউন্সিল ভবনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় নির্ধারিত রোল নম্বরধারী প্রার্থীরা উত্তীর্ণ হয়েছেন। উত্তীর্ণ প্রার্থীরা বাংলাদেশে আইন পেশায় অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছেন।পিএম
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
