পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার পাকুড়িতলা থেকে সোনাপোতা যাওয়ার রাস্তাটি পরিবেশ দূষণ আর দুর্ঘটনার হটস্পট হয়ে উঠেছে। বালু ব্যবসার নামে রীতিমতো পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে এই এলাকাটি। করতোয়া সেতুর পশ্চিমে পাকুড়িতলা এলাকার একদিকে বোদাগামী আঞ্চলিক মহাসড়ক ও অন্যদিকে মাড়েয়াগামী গ্রামীণ সড়ক।পাকুড়িতলায় গুরুত্বপূর্ণ এই সংযোগ স্থলে দীর্ঘদিন থেকে চালু আছে বালু ডাম্পিং ইয়ার্ড। পার্শ্ববর্তী করতোয়া নদীর সোনাপোতা মৌজা থেকে এখানে প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি অর্ধ শতাধিক ট্রাক্টরে করে বালু আনা হচ্ছে। প্রতিনিয়ত ট্রাক্টরে বালু আনার ফলে পাকুড়িতলা থেকে সোনাপোতা যাওয়ার সড়কটিতে বালুর আস্তরণ জমে গেছে। ধুলায় আচ্ছন্ন থাকছে চারপাশ। এর ফলে মটরসাইকেল, সাইকেল, ভ্যান চালক ও আরোহীদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই সড়কটি।টাকাহারা-দেবীগঞ্জ সড়কে বালুর কারণে দ্রুত রোগী পরিবহন অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে জানান অটোচালক সতীশ। তিনি বলেন, গতি বাড়ালেই অটো দুলতে থাকে। সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা শাহাবুল হোসেন জানান, মটরসাইকেলে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে দেবীগঞ্জ আসার পথে পাকুড়িতলার কাছাকাছি এসে বালুতে চাকা স্কিড করায় দুইদিন পড়ে যাওয়ার উপক্রম হন তিনি। দেবীগঞ্জ সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী শিমূল ও সাঈদের ভাষ্য, প্রায় দুই কিলোমিটার ধুলোমাখা রাস্তা পার হতে গিয়ে চোখে-মুখে ধুলা ঢোকা এড়ানো যায় না। শালডাঙ্গা এলাকার বৃদ্ধ শমসের আলী জানান, নিয়মিত যাতায়াতে চোখ জ্বালা করে, কাশি শুরু হয়।দেবীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুমন ধর বলেন, ধুলা দূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানিসহ শ্বাসযন্ত্রের নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় ধুলা দূষণে তারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।শুধু স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নয় নিরাপত্তা ঝুঁকিও প্রকট বোদাগামী আঞ্চলিক মহাসড়কে। এই সড়কে বালু লোডের জন্য ট্রাক-ট্রাক্টর দাঁড় করিয়ে রাখা ও অবৈধ স্থাপনার জন্য সংকীর্ণ হয়ে থাকে সড়কটি। এর আগে গত ২৯ মে এশিয়ান হাইওয়েতে বালু লোডের জন্য ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকায় এক থ্রি-হুইলার দুর্ঘটনায় একই পরিবারের তিনজন নিহত হন, যাদের মধ্যে সাত বছরের এক শিশুও ছিল। সে সময় কিছুদিন নজরদারি থাকলেও বর্তমানে আবারও মহাসড়কে ট্রাক দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে বালু লোডের জন্য।প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে হাইওয়ের সাথে সওজের জমিতে বালু ব্যবসা ও জনদুর্ভোগ বিষয়ে পঞ্চগড়ের নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ বলেন, আমরা সেখান থেকে স্থাপনা ও বালুর স্তূপ সরিয়ে নিতে নোটিশ প্রদান করেছিলাম। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আমরা অবৈধ দখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) পঞ্চগড় জেলার সাধারণ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম জুয়েল বলেন, বালুমহাল ইজারার শর্ত অনুযায়ী বালুমহালের শর্ত অনুযায়ী জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী কাজ নিষিদ্ধ। সেখানে পাকুড়িতলায় বালু ব্যবসাকে ঘিরে পরিবেশ দূষণ অব্যাহত রয়েছে। সরকারের রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সড়ক দুর্ঘটনা রোধে দ্রুত এই ডাম্পিং ইয়ার্ড অন্যত্র স্থানান্তরের দাবি জানান তিনি।সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) পঞ্চগড় জেলা শাখার সমন্বয়ক ডিজার হোসেন বাদশা বলেন, রাজস্ব বৃদ্ধি যেমন প্রশাসনের একটি লক্ষ্য, তেমনি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করাও তাদের দায়িত্ব। সে কারণে সাধারণ মানুষের নাগরিক অধিকার সুরক্ষার স্বার্থে পাকুড়িতলার বালু ডাম্পিং ইয়ার্ড দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া এবং বালু লোড শেষে ট্রাক ও ট্রাক্টরের গায়ে লেগে থাকা বালু পরিষ্কার করার জোর দাবি জানান তিনি।এইদিকে গত ৩০ নভেম্বর দেবীগঞ্জে জেলা প্রশাসক কাজী মো: সায়েমুজ্জামানের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে বাপা’র দেবীগঞ্জ উপজেলা কমিটির পক্ষ থেকে পাকুড়িতলার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানিয়ে সেখান থেকে ডাম্পিং ইয়ার্ড স্থানান্তরের জন্য জেলা প্রশাসকের নিকট লিখিত আবেদন দেওয়া হয়। এমনকি গত ২১ ডিসেম্বর উপজেলা আইনশৃঙ্খলা মিটিং এ ও এই বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি প্রশাসনের পক্ষ থেকে।প্রথমে বালু ব্যবসার সাথে জড়িত নন বললেও পরে দেবীডুবা ঘাটের ইজারাদারের প্রতিনিধি সোলেমান হক বলেন, ওখানেতো কোন সমস্যা নেই। প্রশাসন থেকে যখন যা নির্দেশনা দেয় তখন তা অনুসরণ করা হয়।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, সড়ক ও জনপথকে বলা হয়েছে সেখান থেকে বালুর স্তূপ ও স্থাপনা অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
