রাজশাহীর তানোরে ভূগর্ভস্থ পানি তোলার জন্য খোঁড়া একটি গভীর গর্ত। অজান্তেই সেই গর্তেই পড়ে যায় মাত্র দুই বছরের শিশু সাজিদ। মা কিছুটা সামনে থাকায় প্রথমে বুঝতে পারেননি, কিন্তু হঠাৎ সন্তানের ডাক ‘মা, মা’ শুনে পেছনে তাকাতেই দেখেন গর্তের নিচ থেকে ভেসে আসছে সাজিদের কান্নার শব্দ। শুরু হয় টানা ৩২ ঘণ্টার নিঃশ্বাসবন্ধ করা অপেক্ষা। হাজারো মানুষের প্রার্থনা, উদ্বেগ আর আকুলতা সত্ত্বেও ফায়ার সার্ভিস শিশুটিকে উদ্ধার করলেও ফিরিয়ে আনা যায়নি তার কোমল প্রাণ। থেমে যায় ছোট্ট সাজিদের হাসি, থেমে যায় তার সব স্বপ্ন।এই দৃশ্য যেন মুহূর্তেই দেশবাসীর মনে জাগিয়ে তোলে পুরোনো ক্ষত। সবার হয়তো মনে আছে ২০১৪ সালে ঢাকার শাহজাহানপুরে পানির কূপে আটকে পড়া চারবছরের শিশু জিহাদ। ২৩ ঘণ্টা ধরে শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা চলে। কূপের ভেতর জিহাদের সন্ধান না পেয়ে এক পর্যায়ে দমকল বাহিনী হাল ছেড়ে দেয়। কিন্তু দমকল বাহিনী ঘটনাস্থল থেকে সরে যাওয়ার পর স্থানীয়রা স্ব-উদ্যোগে সেখানে শিশুটিকে বের করার জন্য তৎপরতা শুরু করে।ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কাজ স্থগিত ঘোষণা করার ৫ মিনিট পরই নাটকীয়ভাবে উদ্ধার হয় জিহাদ। এরপর শিশু জিহাদকে মৃত ঘোষণা করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক কে এম নিয়াজ মোর্শেদ।এই ঘটনার ঠিক ১১ বছর পর একইভাবে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছে ছোট্ট শিশু সাজিদ। বুধবার (১০ ডিসেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তানোর উপজেলার পাচন্দর ইউনিয়নের কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামে নলকূপের জন্য খনন করা গর্তে শিশু পড়ে যায়। শিশুটিকে উদ্ধারে কয়েক দফা নলকূপের গর্তে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ক্যামেরা নামায়। কিন্তু গর্তের ভেতরে ওপর থেকে পড়া মাটি ও খড়ের কারণে শিশুটিকে তারা শনাক্ত করতে পারেনি।অবশেষে টানা ৩২ ঘণ্টা নিখোঁজ থাকা শিশু সাজিদকে খুঁজে পাওয়া যায় বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) রাত ৯টা ২ মিনিটে। উদ্ধারের পর শিশু সাজিদকে রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে হয়। পরে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।সাজিদ আর জিহাদ—দুই সময়ের দুই শিশু, কিন্তু পরিণতি একই রকম। তারা আবারও আমাদের সামনে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় কেন আমরা এখনও শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলাম না? কত সাজিদ, কত জিহাদ আমাদের চোখ খুলে দেবে?ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, শিশুটিকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালেই তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন চিকিৎসক।জানা গেছে, বুধবার দুপুরে তানোর উপজেলার কোয়েল হাট পূর্ব পাড়া গ্রামে মায়ের সঙ্গে মাঠে গিয়ে গর্তে পড়ে যায় দুই বছরের সাজিদ। সে একই গ্রামের মো. রাকিবুল ইসলামের ছেলে। স্থানীয়রা জানান, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় এলাকায় গভীর নলকূপ বসানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এরপরও কছির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি পানির স্তর যাচাই করতে গর্ত খনন করেছিলেন। বর্ষায় মাটি বসে গিয়ে গর্তটি আবারও তৈরি হয়, আর সেই অদৃশ্য ফাঁদেই পড়ে যায় শিশু সাজিদ।বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটায় উদ্ধার কাজ শুরু করে ফায়ার সার্ভিসের ৮টি ইউনিট। মূল গর্তের পাশ কেটে এক্সকাভেটর দিয়ে ৪৫ ফুট গভীরতা পর্যন্ত খনন করে অবশেষে সাজিদকে উদ্ধার করা হয়।অপরদিকে, ২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার শাহজাহানপুর রেল কলোনিতে খোলা থাকা গভীর নলকূপে পড়ে যায় চার বছরের জিহাদ। প্রায় ২৩ ঘণ্টা চেষ্টা করেও ফায়ার সার্ভিস কোনও ছবি বা অস্তিত্ব খুঁজে না পেয়ে অভিযান স্থগিতের ঘোষণা দেয়। ঠিক সেই সময় কয়েকজন তরুণের তৈরি যন্ত্র দিয়ে নিচ থেকে উঠে আসে অচেতন জিহাদ। তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেই মৃত্যুর ঘোষণা দেওয়া হয়।মিরপুরের আবু বকর সিদ্দিকের বানানো লোহার খাঁচা দিয়েই সেদিন উদ্ধার হয়েছিল জিহাদ। সারারাত ধরে খাঁচা মেরামত, আবার খাঁচা ঢোকানো শেষ পর্যন্ত তাদের হাতেই ধরা দেয় ছোট্ট শিশুটির নিথর দেহ।রাজশাহীতে সাজিদের হৃদয়বিদারক মৃত্যুর সংবাদ যেন মুহূর্তেই ফিরিয়ে আনল সেই কালো দিনের স্মৃতি। তখনকার প্রত্যক্ষদর্শী ফরহাদ রেজা জানান, জিহাদের সেই মর্মান্তিক দৃশ্য আজও তাকে তাড়া করে। সাজিদের ঘটনায় তিনি আবারও প্রার্থনায় হাত তুলেছিলেন ‘হে আল্লাহ, অন্তত এবার কিছু একটা অলৌকিক হোক।’ কিন্তু প্রার্থনা পূরণ হয়নি। গর্তের অন্ধকার থেকে সাজিদকে তোলা গেলেও তাকে আর ফিরিয়ে আনা গেল না। ক্ষমা কর জিহাদ, ক্ষমা কর সাজিদ এই দেশ তোমাদের জীবিত ফিরিয়ে আনতে পারেনি।এইচএ
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
