চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী হালদা নদী একসময় ছিল স্বাদু পানির প্রাণবৈচিত্র্যের এক অনন্য আশ্রয়স্থল। বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে খ্যাত এই নদী শুধু রুইজাতীয় মাছের আঁতুড়ঘর নয়, ছিল গাঙ্গেয় ডলফিন বা শুশুকেরও নিরাপদ নিবাস। কিন্তু সেই নিরাপত্তা আজ অতীত। গত কয়েক বছরে হালদা নদীর জলে একে একে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে এই নদীর প্রাণ হিসেবে খ্যাত স্বাদু পানির ডলফিন।হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে এই নদীতে মারা গেছে অন্তত ৪৬টি ডলফিন। তাদের অধিকাংশের শরীরে ছিল মারাত্মক আঘাতের চিহ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডলফিনের এই অস্বাভাবিক মৃত্যুহার এখন হালদা নদীর বাস্তুতন্ত্রের জন্য এক ভয়াবহ সংকেত।নদীটির বিভিন্ন স্থানে ইঞ্জিনচালিত নৌযান ও ড্রেজারের বেপরোয়া চলাচল, জাল পেতে মাছ ধরার প্রবণতা, নদীর দূষণ, অবৈধ শিকার এবং প্রাকৃতিক কারণ। এই পাঁচটি কারণেই মূলত ডলফিন মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে বলে গবেষকদের ধারণা। নদীতে জাল ফেলা হলে তাতে আটকা পড়া ডলফিন আধাঘণ্টার মধ্যেই শ্বাসরোধে মারা যায়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জাল টেনে তোলার আগে তাদের জীবন শেষ হয়ে যায়।চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, “২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত হালদায় ৪৬টি ডলফিন মারা গেছে। এই মৃত্যুর পেছনে মানুষের অসচেতনতা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অসামঞ্জস্যতাই মূল কারণ। হালদা নদী এখন এক ভয়াবহ পরিবেশগত সংকটে রয়েছে, যার প্রধান ভুক্তভোগী হচ্ছে স্বাদু পানির এই ডলফিন প্রজাতি।”তিনি আরও বলেন, “হালদাকে টিকিয়ে রাখতে হলে এর ডলফিন সংরক্ষণ অপরিহার্য। ডলফিন শুধু একটি প্রাণি নয়, এটি নদীর স্বাস্থ্যের সূচক। এই প্রজাতি বিলুপ্ত হলে হালদার জীববৈচিত্র্যও ধ্বংস হয়ে যাবে।”পরিবেশবিদরা মনে করেন, হালদা নদীতে চলমান ড্রেজিং, যান্ত্রিক নৌযানের ব্যবহার, এবং নদীর তীরবর্তী এলাকায় শিল্পবর্জ্য নিঃসরণ ডলফিনদের অস্তিত্বকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এক সময় যে নদীকে ডলফিনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচনা করা হতো, এখন সেটিই পরিণত হয়েছে মৃত্যুকূপে।২০০৯ সালে ইন্দোনেশিয়ায় বিশ্বব্যাপী ‘স্বাদু পানির ডলফিন দিবস’ পালনের সূচনা হয়। সেই থেকে বাংলাদেশেও প্রতিবছর এই দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য– “নদীর প্রাণ ডলফিন-শুশুক, নিরাপদে বেঁচে থাকুক।” কিন্তু হালদার বাস্তবতা সেই প্রতিপাদ্যের সঙ্গে এক নির্মম বৈপরীত্য তৈরি করেছে। দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতা চললেও ডলফিন রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ইয়াছিন নেওয়াজ সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, “হালদাকে সরকার হেরিটেজ ঘোষণা করেছে। কিন্তু হালদায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগের অভাব রয়েছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় যদি আমরা একসঙ্গে কাজ না করি, তবে এই নদীর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হবে না।”বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় গাঙ্গেয় ডলফিন একটি নির্দেশক প্রজাতি। এটি নদীর খাদ্যশৃঙ্খলে তৃতীয় স্তরে অবস্থান করে, ফলে নদীর অন্য জলজ প্রাণীদের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ডলফিনের উপস্থিতি নদীর স্বাস্থ্যের প্রতীক, আর এর বিলুপ্তি মানে নদীর প্রাণহানি।২০১৮ সালে হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির এক জরিপে দেখা যায়, নদীতে ডলফিনের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬৭টি। ২০২০ সালে তা নেমে আসে ১২৭টিতে, এবং ২০২২ সালের জরিপে পাওয়া যায় প্রায় ১৪৭টি ডলফিনের অস্তিত্ব। কিন্তু একই সময়ে ডলফিন মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় গবেষকরা আশঙ্কা করছেন, সংরক্ষণে উদ্যোগ না নিলে এই প্রজাতি হালদা থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।বাংলাদেশে শুশুক নামে পরিচিত এই স্বাদু পানির ডলফিন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)-এর লাল তালিকায় ‘বিপন্ন প্রজাতি’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। সারাবিশ্বে এই প্রজাতির সংখ্যা এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০-এর মধ্যে বলে ধারণা করা হয়। এক সময় এই নদীকে তাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ধরা হলেও এখন সেই অবস্থান বদলে যাচ্ছে দ্রুত।পরিবেশবিদরা বলছেন, ডলফিন রক্ষা মানে কেবল একটি প্রাণি সংরক্ষণ নয়, বরং পুরো নদী ও এর জীববৈচিত্র্যকে টিকিয়ে রাখা। কারণ গাঙ্গেয় ডলফিন বেঁচে থাকলে নদীর অন্যান্য বিপন্ন প্রজাতি যেমন কচ্ছপ, ঘড়িয়াল, মসৃণ-আবরণের শুশুকসহ আরও অনেক জলজ প্রাণির জীবনধারাও রক্ষা পাবে।চট্টগ্রামের নদীগুলো– বিশেষ করে কর্ণফুলী, সাঙ্গু ও হালদা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের মেরুদণ্ড। এই নদীগুলো টিকিয়ে রাখার অর্থই হচ্ছে লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষা করা। হালদার ডলফিন রক্ষা তাই কেবল একটি প্রাণিবিজ্ঞানের প্রশ্ন নয়, এটি দেশের পরিবেশ নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নেরও প্রশ্ন।বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নদী সংরক্ষণের নামে যে সব উন্নয়ন প্রকল্প গৃহীত হচ্ছে, তার আগে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা উচিত। নদীতে ইঞ্জিনচালিত নৌযান ও ড্রেজারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ডলফিন রক্ষায় অন্য সব উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যাবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বৃদ্ধি না ঘটালে এই নদীর জীববৈচিত্র্য আর বেশিদিন টিকবে না।একসময় হালদার বুকে লাফিয়ে উঠা শুশুক ছিল জীবন্ত নদীর উদাহরণ। আজ তাদের নিথর দেহ ভেসে উঠে নদীর পাড়ে, আর জেগে ওঠে মানুষের অজুহাত ও অনুশোচনার মিশ্র সুর। নদী এখনও বয়ে যায়, কিন্তু তার বুকের ভেতরে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে প্রাণের প্রবাহ।ইখা
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
