ময়মনসিংহের গৌরীপুরে সোলার প্যানেল প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বুধবার (২২ অক্টোবর) গৌরীপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসারের কার্যালয় এবং বিভিন্ন প্রকল্প এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন দুদক ময়মনসিংহ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ও টিম লিডার রাজু মো. সারওয়ার হোসেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ‘এই উপজেলায় প্রায় ৩০০টি সোলার প্যানেল প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। দুদকের টিম সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পেয়েছে, অধিকাংশ সোলার প্যানেল নষ্ট বা অকেজো অবস্থায় আছে। অনেক জায়গায় সঠিকভাবে প্যানেল স্থাপন করা হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষ এসব প্রকল্প থেকে কোনো সেবা পাচ্ছেন না।’ রাজু মো. সারওয়ার হোসেন আরও বলেন, ‘আমরা যতগুলো প্রকল্প পরিদর্শন করেছি, প্রতিটিতেই অনিয়ম ও দুর্নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণ পেয়েছি। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ ময়মনসিংহের গৌরীপুর টিআর, কাবিখা ২৯০টি প্রকল্পের হরিলুটের তথ্য নিয়ে গত ২০ এপ্রিল ‘সোলার প্যানেল প্রকল্পে লুটপাট’ ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে এ সংবাদটি জাতীয় ও স্থানীয় এবং অনলাইন পত্রিকা সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ সংবাদের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের নির্দেশে তদন্তে মাঠে ময়মনসিংহ জেলা সমন্বিত কার্যালয়। এ অভিযানে আরও অংশ নেন ময়মনসিংহ কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক মো. রেজওয়ান আহমেদ ও ইব্রাহিম খলিল। দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের টিম লিডার সহকারী পরিচালক রাজু মো. সারওয়ার হোসেন আরও বলেন, ‘এক ভবনের ছাদে ১০টি সোলার প্যানেল। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডি অফিসে সোলার প্যানেল খোঁজেও পাওয়া যায়নি। গৌরীপুর কলতাপাড়া সড়কে দু’ প্রকল্পের ৪০টি সোলার প্যানেলের মধ্যে খোঁজ মিলেছে ৩২টি। ইউএনও বাসভবন, উপজেলা পরিষদ, অফিসারদের খেলাঘরসহ বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়েছে। যে সকল মানুষ বিত্তবান, তাদেরকে এসব সোলার প্যানেল দেয়া হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন সেভাবে প্রকল্পের কাজ করা হয়নি।’ তিনি আরও জানান, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসারের কার্যালয়ে কাউকে খোঁজে পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সময় যোগাযোগ করার পরেও এ অফিসের কর্মকর্তা ও অফিস সহকারী আসেননি। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ দিকে জানা যায়, সোলার প্যানেল প্রকল্পে ফ্যাসিস্ট দোসরদের দেয়া সিস্টেমই ছিলো হরিলুটের। প্রত্যেকটি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয় বাজার মূল্যের চেয়ে ৪ গুণ থেকে ১০ গুণ বেশি। ফলে এ সিস্টেমে ময়মনসিংহের গৌরীপুর আসনের তৎকালীন এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজিম উদ্দিন আহমেদ ও তার পুত্র জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক তানজির আহমেদ রাজিবের নেতৃত্বে সোলার প্রকল্পে চলে হরিলুট। ২৯০টি প্রকল্পে নামে মাত্র কাজ করে লুটে নেয়া হয়েছে ৩ কোটি ৯০ লাখ ২৪ হাজার ৫১৬ টাকা। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় সিংহভাগ সোলার প্যানেল বিকল হয়ে পড়েছে। উপজেলার মইলাকান্দা ইউনিয়নের গোবিন্দপুর বাজারে দেয়া সবকটি সোলার প্যানেল স্থাপনের মাত্র ৫/৬ মাসের মধ্যে নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়াও ডৌহাখলা বাজার, কলতাপাড়া সড়ক, পাছার বাজার ও শ্যামগঞ্জ সড়কে স্থাপিত ১১টি স্ট্রীট লাইট দীর্ঘদিন যাবত অচল হয়ে পড়ে আছে। এ উপজেলায় ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা) এর ১ম ধাপে ৫টি প্রকল্পে ৫৬ লাখ ৬৪ হাজার ৪শ টাকা, ২য় ধাপে ১৫টি প্রকল্পে ৫৬ লাখ ৬৪ হাজার ৪শ টাকা, গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) ১ম ধাপে ১৪টি প্রকল্পে ৫১ লাখ ৬২ হাজার ১৭০ টাকা, ২য় ধাপে ১৯টি প্রকল্পে ৫১ লাখ ৬২ হাজার ১৭০ টাকা, ২০১৯-২০২০ অর্থবছর কাবিখা ১ম ধাপে ৫২টি প্রকল্পে ৪৪ লাখ ১২ হাজার ৮শ টাকা, ২য় ধাপে ৬৯টি প্রকল্পে ৪৪ লাখ ১২ হাজার ৮শ টাকা, টিআর ১ম ধাপে ৬০টি প্রকল্পে ৪২ লাখ ৭২ হাজার ৮৮৮ টাকা, ২য় ধাপে ৫৬টি প্রকল্পে ৪২ লাখ ৭২ হাজার ৮৮৮ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ফ্যাসিস্ট সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. ইসমাইল হোসেন ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি সোলার হোম সিস্টেম প্রকল্প বাস্তবায়নে মূল্য পুনঃনির্ধারণ সংক্রান্ত এক অফিস আদেশ জারি করেন। এ আদেশে একটি ২২০ ডব্লিউপি সোলার প্যানেলের মূল্য ৪৯ হাজার টাকা, ৩০০ ডব্লিউপি সোলার প্যানেলের মূল্য ৬৫ হাজার ৩৮০ টাকা, ৪০০ ডব্লিউপি সোলার প্যানেলের মূল্য ৮২ হাজার ৬শ টাকা ধার্য করা হয়। অথচ বাজারে ২৫ বছরের ওয়ারেন্টিসহ রহিম আফরোজ কোম্পানীর ২৫০ ডব্লিউপি সোলার প্যানেলের মূল্য ৮ হাজার ৯২৫ টাকা, ৩২৫ ডব্লিউপি সোলার প্যানেলের মূল্য ১০ হাজার ৯২০ টাকা। ২০১৭ সালের ১৪ মে দেয়া পরিপত্রে কাবিখা ও টিআর প্রকল্পের বরাদ্দকৃত খাদ্যশস্য বা নগদ টাকার অর্ধেক বরাদ্দ দিয়ে সোলার প্যানেল স্থাপন ও বায়োগ্যাস প্রকল্পে ব্যয়ের সিদ্ধান্ত হয়। ওই পরিপত্রে দেশের যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ-সুবিধা নেই বা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন, সেসব এলাকায় সোলার সিস্টেম স্থাপন করতে বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, এতিমখানা, উপাসনালয়, হাট-বাজার, ইউনিয়ন পরিষদসহ জনসমাগম হয়, এমন স্থানে সোলার প্যানেল বসাতে বলা হয়। অথচ এ প্রকল্পের নিয়ম ভেঙে এ নির্বাচনী এলাকার জনপ্রতিনিধির বাসাবাড়ি, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মাঝে বরাদ্দ দেয়া হয় সোলার প্যানেল।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
