সন্ধায় ক্লান্ত ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে হাঁটছেন এক ফেরিওয়ালা। মাঝে মাঝে থেমে থেমে গামছা দিয়ে শরীরের ঘাম মুছার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু বৃষ্টির মতো যেন টপটপ করে শরীর থেকে পড়ছিল ঘাম। বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া শরীর নিয়ে ধীরলয়ে কুঁজো হয়ে হাঁটছেন। কাঁধে বাঁশের ফলা আর দুইদিকে ঝুড়িতে রাখা নতুন পুরাতন কাপড়। কখনো এঁকেবেঁকে চলছেন জীর্ণশীর্ণ শরীর নিয়ে। গ্রামের পথেঘাটে এভাবেই পায়ে হেঁটে দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে চলছে বৃদ্ধ রইস উদ্দিন (৮৮) এর সংগ্রামী জীবনযুদ্ধ।কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের আতকাপাড়া গ্রামের মৃত নায়েব আলীর ছেলে রইস উদ্দিন। আইডি কার্ডের বয়স ৮৮ হলেও তার দাবি, প্রকৃত বয়স শতবর্ষ ইতিমধ্যেই ছুঁইয়েছে।রইস উদ্দিন জীবনে অনেক যুগ পেরিয়ে আসলেও এখনো অভাবের সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করে চলেছেন। গ্রামের আশপাশের অনেকের জীবনে পরিবর্তন আসলেও দীর্ঘ জীবনে এখনো সুখ অধরা এক স্বপ্নের নাম। অভাবে কখনো কারো কাছে হাত পাতেননি। জীবনের ক্রান্তিলগ্নে এসে এখন আর শরীর ঠিকমতো কাজ করছে না। নিজের শরীরের সাথে যেন স্বামী-স্ত্রীর সংসার থমকে আছে। একটু সহানুভূতি আর সহযোগিতা তার জীবনের শেষ সময়ে একটু সুখ এনে দেবে, এমন চাওয়া তার।সরেজমিনে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, রইস উদ্দিন স্বাধীনতার পূর্বে পাকিস্তান আমলে প্রথমে তরকারির ব্যবসা করতেন। এর পর আরো কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসা করেছেন। স্বাধীনতার পর থেকে ফেরিওয়ালা হয়ে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। সেই থেকে আজও গ্রামে ঘুরে নতুন এবং পুরাতন কাপড় বিক্রি করেন। কিন্তু পুঁজির অভাবে ১ হাজার টাকার মালামাল নিয়ে চলছেন প্রতিনিয়ত। বৃষ্টি কিংবা অসুস্থ হলে ঘরবন্দী হয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে হয়। দুই ছেলে দুই মেয়ে তার। আরো আগেই মেয়েদের বিবাহ হয়েছে। এক ছেলে এক বছর আগে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। বর্তমানে আরেক ছেলে ফালু মিয়া (৩৫) নিজের সংসার চালানো নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। সময়ে সময়ে পিতামাতাকে দেখলেও প্রয়োজনের তুলনায় সামান্য। বাধ্য হয়ে একই বাড়ির উঠানে দুই বৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রীর আলাদা সংসার করতে হচ্ছে।রইস উদ্দিনের স্ত্রী আদর বানু (৬০) বলেন, ‘দুঃখ আর কষ্ট আমাদের জীবনের সাথে মিশে আছে। কতদিন না খেয়ে রোজা রেখে পার করছি। আমি সংসারে আসার পর থেকে অভাবের সাথে চলছি। এই বয়সে কত কি খেতে মন চায় কিন্তু সামর্থ্য তো নাই। সরকারি সহায়তা বলতে স্বামী বয়স্ক ভাতা পান। এখন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, কামে যেতে পারছেন না। আমরা কিভাবে বাঁচবো বাবা?’বৃদ্ধ রইস উদ্দিন (৮৮) বলেন, ‘আমার জীবনের সাথে যুদ্ধ করে এখনো চলছি। শক্তি যতক্ষণ আছে ভিক্ষা করবো না। অনেক সময় মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাচ্ছি গেরামে গিয়ে। মানুষ বলে এখন না আসতে আর। কিন্তু কাজ ছাড়া দেখবো কে আমাদের? টাকা নাই তাই পুঁজি কম। পুরাতন কাপড় মানুষ নিতে চায় না এখন। আমার একটি দোকান আর পুঁজি হলে চলতে পারতাম। স্বামী-স্ত্রীর সংসার খুব কষ্টে কাটছে বাজান।’কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাইদুল ইসলাম বলেন, ‘এই বয়সে বৃদ্ধ বাবা রইস উদ্দিনের জীবনযুদ্ধ আমাদের কষ্ট দিচ্ছে। খোঁজ নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা বিভিন্ন সহায়তা দিয়ে তাদের পাশে থাকবো। পাশাপাশি সমাজের দানশীল মানুষ এগিয়ে আসলে এমন জীবন সংগ্রামী মানুষের একটু হলেও স্বস্তি ফিরবে।’এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
