গাজী গোফরান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (চট্টগ্রাম):দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে হঠাৎ করে পণ্য পরিবহন কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অচলাবস্থা। বন্দরে ভারী যানবাহনের প্রবেশ ফি ৫৭ টাকা থেকে এক লাফে ২৩০ টাকা নির্ধারণ করায় বেসরকারি ট্রেইলার ও প্রাইম মুভার মালিকেরা গাড়ি চালানো বন্ধ রেখেছেন। ফলে বন্দরের ভেতর থেকে কনটেইনার সরানো ও দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানোর প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।এই স্থবিরতা কিছুটা শুরু হয় গত ১৪ অক্টোবর থেকে, যখন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নতুন ফি কার্যকর করে। এর আগে বন্দরে প্রবেশকারী ভারী যানবাহনকে প্রতিবারে ৫৭ টাকা পরিশোধ করতে হতো। কিন্তু নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন প্রতিটি প্রাইম মুভার বা ট্রেইলারকে প্রবেশের জন্য দিতে হচ্ছে ২৩০ টাকা।এ সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ট্রেইলার মালিকেরা। তাদের দাবি, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই চারগুণেরও বেশি প্রবেশ ফি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এ অবস্থায় গাড়ি চালু রাখলে প্রতিটি ট্রিপে কয়েকশ থেকে হাজার টাকার বাড়তি খরচ পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বহন করা অসম্ভব।এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম প্রাইম মুভার ও ফ্ল্যাটবেড ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন সময়ের কন্ঠস্বর-কে জানান, “আমরা কোনো কর্মবিরতি বা ধর্মঘট দিইনি। এটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গাড়ি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত। বন্দরে প্রবেশ ফি ৫৭ টাকা থেকে ২৩০ টাকা করা হয়েছে–এই অতিরিক্ত টাকা শ্রমিকরা দেবে নাকি মালিকেরা দেবে, সে সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। তাই আপাতত গাড়ি চালানো বন্ধ রাখা হয়েছে।”তিনি আরও বলেন, “চট্টগ্রাম থেকে প্রাইম মুভার বা ট্রেইলার যখন ঢাকা বা অন্য কোনো গন্তব্যে যায়, তখন লাইন খরচ বা রোড খরচ নির্দিষ্ট থাকে। তেলের দাম বাড়লে সেটি পর্যালোচনা করা হয়। কিন্তু বন্দরের ফি এত হঠাৎ ও একতরফাভাবে বাড়ানো হয়েছে যে তা মানা সম্ভব নয়।”মোহাম্মদ হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর রাত থেকেই তাঁদের আংশিক ট্রেইলার চলাচল বন্ধ রয়েছে। শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) রাত পর্যন্ত আলোচনায় কোনো সমাধান না পাওয়ায় শনিবার (১৮ অক্টোবর) সকাল থেকে বন্দরে কোনো ট্রেইলার প্রবেশ করবে না বলে তিনি জানান।চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কনটেইনার নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি, শহরের বাইরে অবস্থিত বেসরকারি ডিপো বা অফডকগুলোতেও এসব ট্রেইলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখন এসব ট্রেইলার চলাচল বন্ধ থাকায় ডিপোগুলোতেও পরিবহন কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে।একই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেসরকারি ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা-এর মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার জানান, “প্রাইম মুভার মালিকদের ট্রেইলার চলে আন্তজেলা রুটে। ডিপোর ট্রেইলারগুলো বন্দরের কনটেইনার এনে জমা রাখে। এখন প্রাইম মুভার না চলার কারণে কিছু কিছু জায়গায় ডিপো ট্রেইলারের কাজও ব্যাহত হচ্ছে। এতে ধীরে ধীরে ডিপোতে কনটেইনার জমতে শুরু করেছে।”তিনি আরও জানান, “আমরা এখনও সব ডিপোর পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করিনি। তাই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না কতসংখ্যক কনটেইনার আটকে আছে, তবে পরিবহনে যে শৃঙ্খল ভেঙে গেছে তা স্পষ্ট।”চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৪–১৫ হাজার ট্রেইলার ও ট্রাক পণ্য আনা–নেওয়া করে। এই পরিবহন ব্যবস্থার বড় অংশ পরিচালনা করে বেসরকারি মালিকানার প্রাইম মুভারগুলো। বর্তমানে সেগুলোর চলাচল বন্ধ থাকায় বন্দরে পণ্য ওঠানামায় দেখা দিয়েছে বড় ধরনের জট।বন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, যদি দ্রুত সমাধান না আসে, তবে রপ্তানি ও আমদানি–উভয় কার্যক্রমেই বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। কারণ কনটেইনার জট বাড়লে জাহাজ খালাসে বিলম্ব হবে, এতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে “ডেমারেজ” বা বাড়তি চার্জ দিতে হবে।এক ব্যবসায়ী নেতা বলেন, “প্রতিদিনের এই স্থবিরতায় কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এটি শুধু ব্যবসায়ী নয়, পুরো দেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলবে।”বন্দর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বন্দর চেয়ারম্যান বর্তমানে ঢাকায় আছেন। তিনি ফেরার পর মালিকদের সঙ্গে বৈঠক হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।চট্টগ্রাম বন্দর দেশের রপ্তানি ও আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামোয় পরিবহন অচল হয়ে পড়ায় শঙ্কিত ব্যবসায়ী মহলসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও।তাদের আশা, আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান আসবে, নচেৎ দেশের বাণিজ্যচক্রে বড় ধাক্কা লাগতে পারে।ইখা
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
