একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্যকে মূল্যবান সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে কক্সবাজারে প্রথমবারের মতো চালু হলো আধুনিক প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কারখানা। কক্সবাজারের রামু উপজেলার মিঠাছড়িতে স্থাপিত এই কারখানার উদ্বোধন করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ।বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) দুপুরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিরা এই উদ্যোগকে কক্সবাজারে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পর্যটননির্ভর শহর কক্সবাজারে প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৩৪ টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। পর্যটকদের বিপুল আগমন ও বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপ এই বর্জ্যের পরিমাণ আরও বাড়িয়েছে।এর মধ্যে পলিথিন, পণ্যের মোড়ক, পলিপ্রোপিলিন ও পাতলা প্লাস্টিক বর্জ্য সবচেয়ে বেশি- যেগুলো পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা কঠিন এবং বাজারমূল্য প্রায় নেই বললেই চলে।কিন্তু কক্সবাজারের এই রিসাইক্লিং কারখানায় সেই অমূল্য বর্জ্য থেকেই তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব সোফা, বেঞ্চ ও মজবুত খুঁটি- যা টেকসই ও দৃষ্টিনন্দন দুটোই।উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ বলেন, ‘এই প্রকল্প শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নয়, এটি পরিবেশ রক্ষায় ও নারী-পুরুষ উভয়ের কর্মসংস্থানে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে বলে আমরা আশাবাদী।’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বুশরা নিশাত, ইউএনওপিএস বাংলাদেশের টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজর মেইসন সালাম, পৌর প্রশাসক নিজাম উদ্দিন আহমেদ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ইবনে মায়াজ প্রামাণিক, পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিন ও ব্র্যাকের জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী।ইউএনওপিএসের মেইসন সালাম বলেন, ‘এটি এমন একটি দৃষ্টান্ত যেখানে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জকে সম্ভাবনায় রূপ দেওয়া হচ্ছে। প্লাস্টিক দূষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ইউএনওপিএস এই প্রচেষ্টায় অঙ্গীকারবদ্ধ।’ ব্র্যাকের পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী জানান, ‘প্লাস্টিক ফ্রি রিভারস অ্যান্ড সিজ ফর সাউথ এশিয়া (PLEASE)’ প্রকল্পের আওতায় ব্র্যাক কক্সবাজারকে প্লাস্টিক দূষণমুক্ত করার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন কাজ করছে। এই প্রকল্পের অংশ হিসেবেই কক্সবাজার পৌরসভার সহযোগিতায় কারখানাটি স্থাপন করা হয়েছে। এতে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রাহক, বিক্রেতা ও কারখানা শ্রমিকসহ শতাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।৫ হাজার ২৮০ বর্গফুট আয়তনের কারখানাটিতে প্রতি ঘণ্টায় ২০০ কেজি পর্যন্ত প্লাস্টিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব। পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এতে স্থাপন করা হয়েছে ২ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ইটিপি (Effluent Treatment Plant), সোলার পাওয়ার সিস্টেম, ফায়ার সেফটি ইউনিট, ইলেকট্রিক সাবস্টেশন এবং চব্বিশ ঘণ্টার সিসিটিভি নজরদারি ব্যবস্থা।জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ইবনে মায়াজ প্রামাণিক জানান, ‘এই রিসাইক্লিং কারখানার পাশাপাশি কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নতুন স্থাপনা নির্মাণ চলছে। ভবিষ্যতে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগও নেওয়া হবে।’ কারখানাটি দক্ষিণ এশিয়া কোঅপারেটিভ এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম (SACEP)-এর তত্ত্বাবধানে ‘বিশ্বব্যাংক ও ইউএনওপিএস’-এর সহায়তায় বাস্তবায়িত হচ্ছে। ব্র্যাক স্থানীয় অংশীদার হিসেবে প্রকল্পটি পরিচালনা করছে।এই উদ্যোগ কক্সবাজারের পরিবেশে ভারসাম্য আনবে, খাল-বিল ও উপকূলীয় অঞ্চলে প্লাস্টিক দূষণ কমাবে, একই সঙ্গে নারী বর্জ্য সংগ্রাহকদের ক্ষমতায়নের নতুন দিগন্ত খুলে দেবে- এমন প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।এসএম
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
