কক্সবাজারের উপকূলে এখন জেলেদের জালে মাছের চেয়ে বেশি ধরা পড়ছে ভয়। প্রতিদিনের মতো সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলেও ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে, কখনো বা আহত অবস্থায়। কারণ, গভীর রাতে অস্ত্রধারী জলদস্যুরা হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নিচ্ছে নৌকা, মাছ আর জাল।স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী জেলেদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই দস্যুতা পরিচালিত হচ্ছে কক্সবাজার শহরের নতুন বাহারছড়া এলাকার দুই প্রভাবশালী ভাই- উসমান গণি টুলু ও নাসির উদ্দিন বাচ্চুর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে। তাদের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে, জেলেরা ভয় বা প্রতিশোধের আশঙ্কায় মুখ খুলতেও সাহস পান না।শুধু সাম্প্রতিক নয়, গত ১৫-১৬ বছর ধরে এই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে জলদস্যুতা, জেলেদের হয়রানি, ফিশারিঘাটে চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলবাজির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, মহেশখালী ও কক্সবাজার উপকূলে নাছির মাঝি, খাইরুল আমিন মাঝি, মো. ফারুক ও গণি মাঝির মতো কুখ্যাত জলদস্যুরা টুলু- বাচ্চু সিন্ডিকেটের ছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে সাগরে ত্রাস সৃষ্টি করে আসছে।তাদের হাতে জেলেরা প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত, জাল-নৌকা হারাচ্ছে, এমনকি কেউ কেউ জীবনও হারাচ্ছেন। মহেশখালী, কুতুবজোম ও সোনাদিয়া এলাকার জেলেরা বহুবার মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন; কিন্তু প্রশাসনের নিরবতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দস্যু চক্র বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।গত ৯ সেপ্টেম্বর সাগরে ডাকাতির এক ঘটনায় গ্রেপ্তার হন কুখ্যাত জলদস্যু সর্দার ফারুক মাঝি। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। কিন্তু তাকে মুক্ত করার জন্য সক্রিয় রয়েছেন বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন বাচ্চু, এমন অভিযোগ তুলেছেন জেলে ও স্থানীয়রা।জেলেদের ভাষায়, বাচ্চু ভাই এখন জলদস্যুদের অভিভাবক। ফারুককে ছাড়ানোর জন্য তিনি দিনরাত তদবিরসহ ফন্দিফিকির করছেন।অভিযোগ আছে, ফারুককে ‘ভালো মানুষ’ হিসেবে প্রচার করতে কক্সবাজার ফিশারিঘাটের তথাকথিত দাদন মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির প্যাড ব্যবহার করে গণস্বাক্ষর সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বেশিরভাগ ব্যবসায়ী এতে সাড়া দেননি।এক জেলে নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এসব স্বাক্ষর সংগ্রহ মানে ফারুককে নির্দোষ দেখানো। ওর হাতে কত মানুষ পেট খেয়েছে, কত পরিবার নিঃস্ব হয়েছে, তা সবাই জানে।’উসমান গণি টুলু একসময় কক্সবাজার ফিশারিঘাটের নিশান এন্টারপ্রাইজের মালিক ছিলেন। স্থানীয়দের মতে, তার প্রভাব এমন ছিল যে, ঘাটে কোনো ট্রলার ঢুকলে ‘ভাগ’ না দিয়ে কেউ রেহাই পেত না।অভিযোগ আছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বোট মালিক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমানকে ব্যবহার করে এই দস্যু সিন্ডিকেট লুটকৃত মাছ বিক্রি করত। সেসব টাকার অংশ যেত প্রশাসনের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার কাছেও।এক ট্রলার মালিকের ভাষ্য, প্রতি ট্রলার থেকে নির্দিষ্ট হারে টাকা তুলত ওরা। না দিলে ঘাটে বোট ভিড়তে দিত না। টুলু ভাই তখন আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন, কেউ মুখ খোলার সাহস পেত না।২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ নেতা টুলু আড়ালে চলে যান। কিন্তু দস্যু সিন্ডিকেট থামেনি। এখন প্রকাশ্যে জলদস্যুদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন বাচ্চু।স্থানীয় ব্যবসায়ী ও মাঝিমাল্লাদের মতে, সাগরে লুণ্ঠিত মাছ ও জাল বিক্রির দায় এখন মূলত তার হাতেই।একজন ট্রলার মালিক বলেন, ‘আগে আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করে দস্যুতা হতো, এখন বিএনপি নেতার নাম ভাঙিয়ে একই কাজ চলছে। পরিবর্তন শুধু পতাকা আর পোস্টারে।’২০২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর সোনাদিয়ার পশ্চিম পাশে বঙ্গোপসাগরে কুতুবজোম ইউনিয়নের জেলে খাইরুল আমিনের মালিকানাধীন ‘এফবি আল্লাহর দান’ বোটে হামলা চালায় জলদস্যুরা। সেই হামলায় লুট হয় প্রায় ৫ লাখ টাকার মাছ, ৭ লাখ টাকার জাল ও আরও ৩ লাখ টাকার সম্পদ। একই সময় স্থানীয় মেম্বার শামসুল ইসলাম বাদশার বোটেও হামলা হয়, কিন্তু মামলা নেয়নি পুলিশ। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা মুজিবুর রহমানের প্রভাবে মামলা চাপা পড়ে যায়।এরপর ২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ভোরে আবারও হামলা হয় মাতারবাড়ি ইউনিয়নের সাইবার ডেইল এলাকায়। রুবেল (২৬) নামের এক যুবকের নেতৃত্বে ১৬ জন জলদস্যু ট্রলারে হামলা চালিয়ে ৭০ হাজার টাকার মাছ, ২৫ হাজার টাকা নগদ ও ২০ হাজার টাকার মোবাইল লুট করে। এই ঘটনায় মামলা হয় মহেশখালী থানায় (নম্বর- ২১, জিআর- ২৭৪, তারিখ ১২.৯.২০২৫)। মামলার অন্যতম আসামি ফারুক মাঝি এখন কারাগারে, আর তাকে ছাড়াতে ব্যস্ত সেই বাচ্চু সিন্ডিকেট।এক জেলে সংগঠনের নেতা বলেন, ‘প্রতিবারই প্রশাসন বলে অভিযান চলছে, কিন্তু সাগরে দস্যুদের বোট এখনো ঘুরে বেড়ায়। ধরা পড়লেও তারা অল্পদিনেই বেরিয়ে আসে।’আরেকজন মৎস্য ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি বহুবার। কিন্তু যাদের হাতে বন্দুক, তাদের পেছনে আছে রাজনৈতিক ক্ষমতা- এটা সবাই জানে।’এক প্রবীণ জেলে কণ্ঠ ভারী করে বলেন, ‘আমরা তো সমুদ্রকে মা বলি, এখন সেই সাগরই মৃত্যুভূমি হয়ে গেছে।’আরেক তরুণ মাঝি বলেন, ‘মাছ ধরলে জলদস্যুরা লুট করে, না ধরলে সন্তান না খেয়ে থাকে। আমাদের জীবনে আর কোনো নিরাপত্তা নেই।’তাদের মতে, এই ভয়, ক্ষতি আর প্রতারণার গল্প কেবল অর্থনৈতিক নয়- এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রতিচ্ছবি। বছরের পর বছর যারা জলদস্যুদের রক্ষা করেছে, তারা আজও অপ্রতিরোধ্য। রাজনীতির পতাকা পাল্টেছে, কিন্তু দস্যুতার রং পাল্টায়নি।এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত নাসির উদ্দিন বাচ্চুর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে উসমান গণি টুলুর নাম্বারে কল দেওয়া হলেও ফোনে সংযোগ পাওয়া যায়নি।মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুরুল হক বলেন, ‘সাগরে জলদস্যুতা রোধে প্রশাসন সর্বদা সজাগ। নিয়মিত অভিযান চলছে। জলদস্যু ফারুকের গ্রুপসহ অন্যদের বিরুদ্ধেও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।’তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। প্রমাণ পেলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’পিএম
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
