শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) একসময় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কোলাহলে প্রাণবন্ত থাকলেও, বর্তমানে তা এক গুরুতর সংকটে ভুগছে, যেখানে ২০২০ সালের পর থেকে কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি। শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ সেশনজট, গবেষণার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং নোংরা রাজনীতির কারণে বিদেশী শিক্ষার্থীদের আগ্রহ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।বিগত বছরগুলোতে তৈরি হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং করোনাকালীন জটিলতার প্রভাবেই এই অনীহা সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা যায়। এছাড়া, বছরের শেষ ভাগে ভর্তিপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় বিদেশী শিক্ষার্থীদের অনেকটা সময় নষ্ট হয়, যা তাদের আগ্রহ হারানোর অন্যতম কারণ।বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, শেকৃবিতে বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি কমার ধারা শুরু হয় ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে। ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকে মোট ৫২ জন বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও, সংখ্যাটি ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। ২০১৬ সালে ৯ জন এবং ২০১৯ সালে ১৪ জন ভর্তি হলেও, ২০২০ সালে এই সংখ্যা নেমে আসে মাত্র দুজনে। এরপরের বছরগুলোতে ভর্তির সংখ্যা একেবারেই শূন্যের কোঠায় ঠেকে। এই ধারাবাহিক পতন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক অবস্থান সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তাকে তুলে ধরে।শিক্ষার্থীদের মতে, এই সংকটের পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। ১৯ ব্যাচের বিদেশী শিক্ষার্থী প্রজ্জল ভান্ডরী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক অবস্থান সুদৃঢ় করতে গবেষণার ক্ষেত্রে সৃষ্টি করা, ল্যাবগুলোর মান উন্নত করা, শিক্ষক সংকট দ্রুত নিরসন এবং শিক্ষকদের পড়ানোর গুণগত মান বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেন। তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক পরিচিতি তৈরি করতে বিদেশের বিভিন্ন এডুকেশন ফেয়ারে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।বর্তমানে অধ্যয়নরত নেপালী শিক্ষার্থী রিতু চ্যালসি আরও গভীর সমস্যার দিকে আলোকপাত করেন। তিনি জানান, ‘শিক্ষকরা বাংলায় ক্লাস নেওয়ায় নতুন শিক্ষার্থীদের বুঝতে কষ্ট হয় এবং ওয়েবসাইটে সুনির্দিষ্ট তথ্যভান্ডার (ডাটাবেস) না থাকায় তারা আগ্রহ দেখান না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অতীতে রাজনৈতিক দলগুলোর জোর করে প্রোগ্রামে নিয়ে যাওয়া এবং সিট ফেলে দেওয়ার হুমকির মতো ঘটনা বিদেশী শিক্ষার্থীদের মনে অনিরাপত্তা ও ভীতি তৈরি করেছে, যা তাদের এখানে না আসার প্রধান কারণ। এছাড়াও, স্নাতক শিক্ষার্থীদের গবেষণার আগ্রহ শিক্ষকদের দ্বারা নিরুৎসাহিত হওয়া, কিছু অনুষদে নম্বর টেম্পারিং-এর মতো অনিয়ম, এবং হাসপাতালের অনুন্নত অবস্থাও পরিবেশকে প্রতিকূল করে তোলে।’এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. বেলাল হোসেন বলেন, ‘রাজধানীর ভিতরে হওয়ায় গবেষণা ও গবেষণা মাঠের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা বিদেশী শিক্ষার্থীরা বড় করে দেখেন। তবে এই সংকটে আমরা “খুবই কনসার্ন” এবং সমাধানে হবে দ্রুত।’তিনি জানান, ‘এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল গুরুত্বপূর্ণ নোটিশ বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতে প্রকাশিত হবে এবং বিদেশী শিক্ষার্থীদের ডাটাগুলো ওয়েবসাইটে যোগ করা হবে। এছাড়াও, বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশী শিক্ষার্থী নিয়ে আসার বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে কো-অপারেশন করবে।’বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. আব্দুল লতিফ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের প্রতি আমরা সবসময় সহানুভূতিশীল এবং নম্বর সংক্রান্ত যেকোনো অসঙ্গতি (টেম্পারিং) দেখা দিলে শিক্ষার্থীরা যেন দ্বিধাহীনভাবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সাথে কথা বলে প্রয়োজনে আমার কাছে আসে।’তিনি আরও বলেন, ‘গবেষণামূলক কাজে (রিসার্চ) কোনো শিক্ষার্থী আগ্রহ প্রকাশ করলে, বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্যই সকল প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা করে এবং ভবিষ্যতেও করবে। তিনি বিদেশী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবারে সর্বদা স্বাগত জানাতে এবং তাদের প্রয়োজনীয় সকল প্রকার সাহায্য-সহযোগিতা প্রদান করতে প্রস্তুত আমরা।’এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
