শুধু একটি মেডিকেল রিপোর্ট। আর তাতেই থেমে গেল এক খেটে খাওয়া মানুষের জীবনের স্বাভাবিক গতি। আদালতের বারান্দা আর কারাগারের দেয়ালে বন্দি হয়ে গেল ১৪টি দিন। যেগুলো তার জীবনের সবচেয়ে অন্ধকারময় অধ্যায়। নওগাঁর বদলগাছীর আদিত্যপুর গ্রামের ভ্যানচালক দেলোয়ার হোসেন (৪৫) আজও বুঝে উঠতে পারছেন না, ঠিক কোন অপরাধে তাকে এমন নির্মম পরিণতি ভোগ করতে হলো।জানাগেছে, ২০২৪ সালের ২১ জুলাই প্রতিদিনের মতোই ভ্যান গাড়ি নিয়ে বের হয়েছিলেন দেলোয়ার। তবে গ্রামের জমিজমা নিয়ে পুরনো বিরোধে জড়িয়ে পড়েন প্রতিবেশী মোজাফ্ফর হোসেন ও তার ভাই আব্দুর রহমানের সঙ্গে। তর্কবিতর্ক থেকে ধাক্কাধাক্কিতে গড়ালেও কারও শারীরিক ক্ষতি হয়নি বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। পরদিন ঘটনাটি নাটকীয় মোড় নেয়। মোজাফ্ফর ও আব্দুর রহমান হাসপাতালে গিয়ে বানিয়ে ফেলেন এক ভুয়া মেডিকেল রিপোর্ট। তাতে লেখা হয়, একজনের হাত আরেকজনের পা ভেঙে গেছে। সেই রিপোর্টকে হাতিয়ার করে আদালতে মামলা করা হয় দেলোয়ারসহ আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে।মিথ্যা মামলায় কারাভোগ:নিয়মিত হাজিরা দিতে গিয়ে আদালতের আদেশে কারাগারে পাঠানো হয় দেলোয়ারকে। চলতি বছরের ২৩ জুলাই থেকে ৬ আগস্ট- ১৪ দিন নরকযন্ত্রণার মতো কারাভোগ করতে হয় তাকে। কান্নাজড়িত কন্ঠে তিনি বলেন, আমি কোনো অন্যায় করিনি। বিনা দোষে জেলে ছিলাম। আমার বৃদ্ধা মা তখন ঘরে একা ছিলেন। কীভাবে যে কেটেছে সেই সময়টা, তা শুধু আল্লাহই জানেন।দেলোয়ার হোসেনের চোখে এখনো কান্না জমে থাকে। তিনি আজও ন্যায়বিচারের আশায় দিন গুনছেন। বলছেন, আমি চাই সত্য উন্মোচিত হোক। যারা মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছে, তারা যেন বিচার পায়।সম্প্রতি এ বিষয়টি জানতে পেরে অনুসন্ধানে নামলে সাংবাদিকদের হাতে আসে ঘটনার কয়েকদিন পরের দুটি ভিডিও ফুটেজ। একটিতে দেখা যায়, ‘পা ভাঙা’ মোজাফ্ফর দিব্যি সাইকেল চালাচ্ছেন। অন্যটিতে ‘হাত ভাঙা’ আব্দুর রহমান কোদাল দিয়ে জমিতে কাজ করছেন।গ্রামের বাসিন্দারা বলেন, ‘যাদের বলা হচ্ছে হাত-পা ভাঙা, তারাই মাঠে কাজ করছে। এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচার আগে দেখিনি।’গ্রামের বাসিন্দা আবু বক্কর, বাবু, রেজাউলসহ অনেকে বলেন, যাদের বলা হচ্ছে হাত-পা ভাঙা, তারা নিজেরাই মাঠে কাজ করছে। এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচার আমরা আগে দেখিনি।ভুয়া রিপোর্টের উৎস কোথায়:ভুয়া মেডিকেল রিপোর্ট কোথা থেকে এলো, সেই প্রশ্নে সরব সবাই। পাশ্ববর্তী জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত আরএমও রায়হানুল ইসলাম ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। তবে অফ-ক্যামেরায় জানান, ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভুয়া রিপোর্ট দেওয়ার সুযোগ নেই।নওগাঁ জর্জ কোর্টের আইনজীবী কাজী আতিকুর রহমান রিপন বলেন, ‘আইনের উদ্দেশ্য হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন আইনকে অস্ত্র বানিয়ে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করা হয়, তখন সেটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।’ তিনি আরও জানান, ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ২১১ অনুযায়ী, মিথ্যা মামলার দায়ে দায়ী ব্যক্তিকে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যায়। ঘটনার বিষয়ে মামলার বাদি মোজাফ্ফর হোসেন ও আব্দুর রহমানের গ্রামের বাড়ি আদিত্যপুর গিয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি। মোজাফ্ফরের ছেলে ফিরোজ হোসেনের মোবাইল নম্বর পাওয়া গেলেও বাবার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নানা তালবাহানা করেন। কখনো বলেন, তিনি বাইরে আছেন, কখনো বলেন, বাবা বাড়িতে নেই। ফলে তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।জানতে চাইলে বদলগাছী থানার ওসি আনিছুর রহমান বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি থানায় কর্মরত ছিলাম না। তবে যদি ঘটনা সত্যি হয়, তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক।তদন্ত কর্মকর্তা নিহার চন্দ্র (বর্তমানে র্যাবে কর্মরত) বলেন, মেডিকেল রিপোর্টের বাইরে আমাদের কিছু করার সুযোগ নেই। তবে আমি জানি, মোজাফ্ফর সুবিধার লোক নয়।এসকে/আরআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
