ফেব্রুয়ারির প্রথম ভাগে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রস্তুতির এক মহাযজ্ঞে নেমেছে চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিস। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী ধাপে ধাপে এগোচ্ছে সকল আয়োজন। নির্বাচন যেন সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয়–এমন প্রত্যাশায় জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের কর্মকর্তা–কর্মচারীরা দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন।এবারের নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই প্রকাশ করা হয়েছে খসড়া ভোটকেন্দ্র তালিকা ও ভোটার তালিকা। মজুত করা হয়েছে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, প্রস্তুত হচ্ছে বিশাল ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল। সবমিলে চট্টগ্রাম এখন নির্বাচনের পূর্ব প্রস্তুতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের জন্য নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত খসড়া তথ্য অনুযায়ী এবারে ভোটকেন্দ্র কমেছে ৬৪টি এবং বুথ কমেছে ১,০৭৬টি। সর্বশেষ খসড়া অনুযায়ী মোট ভোটকেন্দ্র দাঁড়িয়েছে ১,৯৫৯টি এবং বুথ ১২,৬৫৬টি। এর মধ্যে পুরুষ বুথ ৫,৭৬৪টি এবং মহিলা বুথ ৬,৮৯২টি।তুলনামূলকভাবে দেখা যায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রামের মোট ভোটকেন্দ্র ছিল ২,০২৩টি এবং বুথ ছিল ১৩,৭৩২টি। যদিও এবারে সংখ্যা কিছুটা কমেছে, তবে নির্বাচন কমিশনের দাবি–ভোটকেন্দ্র ও বুথগুলোকে আরও সুসংগঠিত ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে ভোটারদের জন্য স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।ভোটগ্রহণের প্রধান উপকরণ ব্যালট বাক্স নিয়েও নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বুথে একটি এবং প্রতি ভোটকেন্দ্রে একটি অতিরিক্ত ব্যালট বাক্স বরাদ্দ থাকে।চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের জন্য প্রয়োজন হবে ১৪,৬১৫টি স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স। কিন্তু বর্তমানে জেলা নির্বাচন অফিস ও উপজেলা পর্যায়ের স্টোরে মজুত রয়েছে ১৫,৯৪৪টি ব্যালট বাক্স। অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে প্রায় ১,৩২৯টি বেশি ব্যালট বাক্স সংরক্ষণে রাখা হয়েছে।একজন নির্বাচন কর্মকর্তা বলেন, ‘কোন বুথে একই সময়ে একাধিক ব্যালট বাক্স ব্যবহার করা হয় না। তবে বাড়তি ব্যালট বাক্স হাতে থাকলে নির্বাচনের দিন কোনো কারণে ক্ষতি বা সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়।’চট্টগ্রামে প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকায় ছবিসহ যুক্ত হয়েছেন নতুন ৩ লাখ ৪২,৮৩ জন ভোটার। এর মধ্যে ১৫ উপজেলায় ২ লাখ ৫২২৮৩ জন এবং চট্টগ্রাম মহানগরে ৫২ হাজার জন নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন।৩১ অক্টোবর পর্যন্ত যাদের বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হবে, তারাও চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবেন।সবশেষ খসড়া তথ্য অনুযায়ী চট্টগ্রামে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৬ লাখ ৬৮,৫১৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩৪ লাখ ৪৮,৫৪৮ জন এবং মহিলা ভোটার ৩২ লাখ ১৯,৯১৭ জন। কেবল চট্টগ্রাম মহানগরীতেই ভোটার সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ (১৯ লাখ ৯২,৭৮৭ জন)।৪৪ হাজার ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার বিশাল প্যানেলভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের জন্য তৈরি করা হচ্ছে প্রায় ৪৪ হাজার ভোটগ্রহণ কর্মকর্তার একটি বিশাল প্যানেল।সংখ্যার বিচারে– ১,৯৫৯ জন প্রিসাইডিং অফিসার, ১২,৬৫৬ জন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার এবং ২৫,৩১২ জন পোলিং অফিসার। এছাড়া অতিরিক্ত ১০ শতাংশ কর্মকর্তার সংরক্ষিত তালিকাও থাকবে।এ লক্ষ্যে গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকে সরকারি–আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক–কর্মকর্তাদের তালিকা চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।এই প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলার সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মো. বশির আহমেদ সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্যানেল তৈরির কাজ চলছে। প্রতিটি অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য একটি নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নির্বাচন আয়োজন।’যদিও প্রস্তুতির ধাপগুলো ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে, তবে চট্টগ্রামের নির্বাচনী পরিবেশ সব সময়ই আলোচনায় থাকে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে। পূর্ববর্তী নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে– কিছু এলাকায় ভোটকেন্দ্র দখল ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। একাধিক কেন্দ্রে অনিয়ম ও ব্যালট বাক্স ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছিল এবং যথাসময়ে নির্বাচনী সরঞ্জাম পৌঁছাতে বিলম্ব হয়েছিল।এবার তাই নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সেনা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে গঠন করা হবে বিশেষ টিম। সংবেদনশীল এলাকায় থাকবে বাড়তি নজরদারি।নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, প্রিজাইডিং অফিসারদের প্রশিক্ষণ এবং ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো হবে। প্রত্যেক ভোটকেন্দ্রে থাকবে ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা, যাতে ভোটগ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে।চট্টগ্রাম এখন নির্বাচনী প্রস্তুতির মহাসমারোহে। ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ থেকে শুরু করে ব্যালট বাক্স মজুত, ভোটার তালিকা হালনাগাদ থেকে কর্মকর্তা নিয়োগ–সব কিছু চলছে পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী।একইসঙ্গে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, ও সম্ভাব্য অনিয়ম ঠেকাতে নেওয়া হচ্ছে বহুমুখী উদ্যোগ। নির্বাচন কমিশন বলছে, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনই আমাদের মূল অঙ্গীকার।’এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
