পাবনার ঈশ্বরদীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপূজায় দরিদ্র মহলকে সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচয়ে সরকারি অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে পূজায় সেই সরকারি অনুদান পাওয়ার আশায় বুক বেঁধে বসে আছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের হতদরিদ্র এ মহলটি।এখন অনুদান তো দূরের কথা, অনুদানের নামে যে টাকা নেওয়া হয়েছে, তাইই ফেরত অনিশ্চিত হয়ে গেছে। যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না অনুদান বিষয়ে যোগাযোগ করা মুঠোফোন নম্বরেও। কষ্ট করে উপার্জিত টাকা প্রতারণা চক্র হাতিয়ে নেওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে ভুক্তভোগী এ হতদরিদ্র মানুষগুলো। বলছিলাম উপজেলার বাঘইল দাশপাড়া গ্রামে অনুদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কৌশলে টাকা হাতিয়ে নেওয়া একটি ঘটনার কথা।সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, ঈশ্বরদী উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচয়ে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি সূনীল চক্রবর্তীর মুঠোফোনে স্থানীয় মন্দির এলাকায় ৫ জন হতদরিদ্র পরিবারের জন্য অনুদান বরাদ্দ হয়েছে বলে জানানো হয়। সূনীল চক্রবর্তী বাঘইল দাশপাড়া গ্রামের শ্রী শ্রী বারোয়ারী মাতৃ মন্দির কমিটির সভাপতি শ্রী পলাশ চন্দ্রকে জানান, উপজেলা পরিষদ থেকে দূর্গাপূজা উপলক্ষে নগদ ৪২০০ টাকা ও চাল-ডাল তেলসহ বেশ কিছু সরকারি অনুদান দেওয়া হবে। নিজ এলাকার ৫ জন বাসিন্দার জন্য বরাদ্দকৃত অনুদান গ্রহণ করতে উপজেলা পরিষদের একটি মোবাইল নম্বর প্রদান করে সেই নম্বরে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে সেই নম্বরে যোগাযোগ করলে আরো কিছু অনুদান দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয় পলাশ চন্দ্রকে। সেই প্রতারক চক্রের কথানুযায়ী উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করা হলে সেখান থেকে উত্তর আসে আপাততঃ অনুদান ফরম ফাঁকা নেই। বাড়তি অনুদান নিতে হলে ফরম ফিলাপ বাবদ ৬০০ টাকা করে দিতে হবে। পলাশ চন্দ্র নিজ এলাকার অন্যান্য দরিদ্র বাসিন্দাদের সঙ্গে অনুদানের ব্যাপারে কথা বললে ৩৬টি পরিবারের নিকট থেকে মোট ২১ হাজার ৬ শত টাকা উত্তোলন করে উর্ধ্বতন কর্মকর্তার দেওয়া বিকাশ নম্বরে (০১৮৮০-৩৪৬৬৬৫) সেই টাকা প্রেরণ করা হয়। টাকা দেওয়ার পরই প্রতারক চক্রের চিত্র রূপ নেয় ভিন্ন রূপে। টাকা প্রেরণের পরদিনই ওই একই নম্বর থেকে পুনরায় মুঠোফোনের মাধ্যমে সরকারি অনুদানের গাড়ি খুব শিগগিরই তাদের প্রাপ্য অনুদান পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। তবে দিন যায়, দিন আসে কিন্তু কোন অনুদানই এসে আর অপেক্ষমাণ ভুক্তভোগীদের হাতে পৌঁছায় না। টাকা লেনদেন করা উক্ত নম্বরটিও বন্ধ, কোনভাবেই সম্ভব হচ্ছেনা যোগাযোগ করা।এদিকে টাকা পাঠানোর পরদিনই নম্বরদাতা সূনীল চক্রবর্তীকে বিষয়টি জানালে তিনি নিশ্চিত করেন নম্বরটি ভুয়া। তিনি আরো জানান, নম্বরটি সঠিক কি না তা যাচাই করে জানাবো বলে নানান রকম তালবাহানা করে মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। এখন পর্যন্ত ভুক্তভোগীদের সঙ্গে তার কোনপ্রকার যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এভাবে কষ্টে উপার্জিত টাকা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়ায় ভুক্তভোগীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তারা অভিযোগ করে জানিয়েছেন এ প্রতারণা চক্রের সঙ্গে পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি সূনীল চক্রবর্তী সরাসরি জড়িত।ক্ষোভ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী শ্রী জয় চন্দ্র দাশ, ভারতী রাণী ও পারুল নামে কয়েকজন বলেন, ‘আমাদের ধর্মীয় উৎসব দূর্গাপূজায় উপজেলা থেকে অনুদান দেওয়া হবে বলে আমাদের কষ্টে উপার্জিত টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সূনীল চক্রবর্তী যে নম্বরে টাকা পাঠানোর পর থেকে নম্বরটি বন্ধ। অনুদান তো দূরের কথা, আমাদের থেকে নেওয়া টাকাটাও তারা কৌশলে হাতিয়ে নিয়েছে। এমন ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দাবি ও আমাদের কষ্টের টাকা ফেরত চাই।’বাঘইল দাশপাড়া শ্রী শ্রী বারোয়ারী মাতৃ মন্দির কমিটির সভাপতি শ্রী পলাশ চন্দ্র বলেন, ‘গত ১০ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরদী উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি সূনীল চক্রবর্তী আমাকে মুঠোফোনে ৫ জনের নামে অনুদান বরাদ্দ হয়েছে জানিয়ে উপজেলা পরিষদে যোগাযোগের একটি নম্বর দিলে সেখানে যোগাযোগ করে তাদের পরামর্শ অনুযায়ী সেই অনুদান গ্রহণ করতে সরল মনে ৩৬ জনের থেকে ২১ হাজার ৬ শত টাকা উত্তোলন করে বিকাশে প্রেরণ করি। টাকা দেওয়ার পর থেকে ওই নম্বরটি বন্ধ পাচ্ছি। এদিকে সূনীল চক্রবর্তীর সঙ্গেও কোনভাবেই যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। আমি চাই দরিদ্র এসব মানুষের টাকা ফেরত দেওয়া হোক এবং এমন প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দাবি করছি।’এ ব্যাপারে ঈশ্বরদী পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি সূনীল কুমার দাশের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচয় দিয়ে অনুদানের কথা জানালে আমি দরিদ্রদের কথা ভেবে তাদের নম্বরটি দিয়েছি কিন্তু বুঝতে পারিনি এটা প্রতারক চক্র। বিষয়টি নিয়ে থানায় অভিযোগ করার প্রস্তুতি চলছে। দেখা যাক কি হয়।’পাবনা জেলা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি প্রভাশ ভদ্রা বলেন, ‘বিষয়টি স্বল্প পরিসরে জানতে পেরেছি কিন্তু এত বড় প্রতারণা হয়েছে সেটা জানা ছিল না। এ ব্যাপারে সূনীল চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখি কিছু করতে পারি কি না।’ঈশ্বরদী উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ আতিকুর রহমান বলেন, ‘দূর্গাপূজাতে কোন অনুদান দেওয়া হচ্ছে না। আর সমাজসেবা কার্যালয় থেকে কাউকে ফোনও করা হয়নি। এটা প্রতারক চক্রের কারসাজি হতে পারে। সকলকে সচেতন থাকার আহবান করছি।’এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
