দীর্ঘ নয় বছর পর হতে যাওয়া কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দলের গঠনতন্ত্রের ‘এক নেতা এক পদ’ নীতি লঙ্ঘন নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আগামী ২০ সেপ্টেম্বর জেলা শহরের পুরাতন স্টেডিয়ামে সম্মেলন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। এতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বলে জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন।সম্মেলনে তৃতীয়বারের মতো সভাপতি হিসেবে কাউন্সিলে প্রতিদ্বন্দিতা করতে মনোনয়নপত্র জমা করেছেন বর্তমান সভাপতি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ শরীফুল আলম। তাঁর পুণরায় সভাপতি হতে চাওয়াকে কেন্দ্র করেই বিতর্কের সূত্রপাত। কারণ বিএনপির গঠনতন্ত্রের ১৫ ধারায় বিশেষ এই বিধানের ‘ক’ উপধারায় উল্লেখ আছে যে, ‘কোন ব্যক্তি একই সঙ্গে দলের জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা, পৌরসভা, ইউনিয়ন কিংবা ওয়ার্ড কমিটিতে সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হতে পারবেন না।’ সেই সাথে ‘খ’ উপধারায় উল্লেখ আছে যে, ‘দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটি কিংবা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের কোনো সদস্য, জাতীয় নির্বাহী কমিটির কোনো কর্মকর্তা এবং দলের অঙ্গদল কিংবা সহযোগী সংগঠনের কোনো সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদক দলের অন্য কোনো পর্যায়ের কমিটিতে কর্মকর্তা নির্বাচিত হতে পারবেন না। তবে অনিবার্য কারণে দলের চেয়ারম্যান সাময়িকভাবে ব্যতিক্রম অনুমোদন করতে পারবেন।’জানা গেছে, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সর্বশেষ দ্বিবার্ষিক সম্মেলন হয়েছিল ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর পর আগামী ২০ সেপ্টেম্বর শনিবার বিশাল আয়োজনের মধ্য দিয়ে হতে যাচ্ছে জেলা বিএনপির সম্মেলন। যদিও নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ জেলায় সব সময় আধিপত্য বিস্তার করলেও সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগও নানা দ্বন্দ্ব-কলহে নানা সমীকরণে বিভক্ত ছিল। জেলা বিএনপিও এর বাইরে ছিল না। অনৈক্য গত দুই দশকের রাজনীতিতে জেলা বিএনপিকে এক হতে দেয়নি। গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর জেলা বিএনপিসহ মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নামে। বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতা-কর্মীসহ জনগণের ব্যাপক উপস্থিতি জেলায় দলটির শক্তিশালী অবস্থান জানান দেয়। যদিও রাজনীতি সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন আসেনি। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে শহরে শতাধিক তোরণ নির্মাণের উদ্যোগ সাধারণ মানুষ ইতিবাচকভাবে দেখছে না। পাশাপাশি কিছু পাতি নেতার লাফালাফিও পছন্দ করছে না। প্রবীণ রাজনৈতিকরা মনে করেন, এসব থেকে বের হতে পারলে বিএনপি এ জেলার রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে জনগণকে সাথে নিয়ে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারে। তাই দীর্ঘদিন পরে হতে যাওয়া জেলা বিএনপির এই সম্মেলনে নেতৃত্বে কারা আসছেন এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। বিএনপির তৃণমূল থেকে শুরু করে জেলাসহ সর্বত্র চলছে নানা সমীকরণ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।জেলা বিএনপি একাধিক সূত্র মতে সাবেক স্বৈরশাসকের নানাবিধ তৎপরতায় উচ্ছ্বাস ও আনন্দময় পরিবেশে দলীয় কর্মকাণ্ড করতে না পারলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বেশ ঘটা করে সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে। ৯ বছর পর বিএনপির সম্মেলন ঘিরে পুরো শহর সেজেছে নতুন নেতৃত্বে আসা নেতাদের ছবি, ব্যানার, ফেস্টুন আর বিলবোর্ডে। এই সম্মেলন ঘিরে ৯ বছর হামলা, মামলা, নির্যাতন ও কারাবরণে জর্জরিত নেতাকর্মীরা ফিরে পেয়েছেন প্রাণচাঞ্চল্য। কর্মীরাও মুখে আছেন নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ে।নেতাকর্মীরা বলছেন, ‘দলের দুর্দিনে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, নির্যাতন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন তারা যেন সঠিক মূল্যায়ন পান। এছাড়াও সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নতুন করে দলকে পুনরুজ্জীবিত ও সুসংগঠিত করে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে বিজয়ী করতে ভূমিকা রাখবে এমন নেতৃত্ব চান নেতাকর্মীরা।’জেলা বিএনপির বর্তমান সহসভাপতি ও জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সচিব বর্ষীয়ান রাজনীতিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিরুজ্জমান বলেন, ‘উনি (শরীফুল আলম) দলের বিধি-বিধান মানছেন না। টাকা ও ক্ষমতার জোরে সবকিছু ম্যানেজ করছেন।’জেলা বিএনপির বর্তমান সহসভাপতি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম খান চুন্নু বলেন, ‘অর্থের জোরে প্রভাব খাটিয়ে দলে উপরে-নীচে সবাইকে ম্যানেজ করে শরীফুল আলম গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টির পথকে রুদ্ধ করছেন।’এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপির কেন্দ্রীয় জ্যেষ্ঠ মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী জানান, ‘এই প্রশ্নের উত্তরটা শরীফুল আলমের কাছেই জানাতে চান।’জেলা বিএনপির সভাপতি ও সম্মেলনে সভাপতি পদ প্রত্যাশী মোঃ শরীফুল আলম জানান, ‘শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ও খায়রুল কবীর খোকনসহ অনেক নেতাই কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি জেলা কমিটিতেও আছেন। কাজেই আমার ক্ষেত্রেও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হচ্ছে না।’সম্মেলনে নতুন কমিটি গঠনে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমানের কাছে গঠনতন্ত্র মোতাবেক নির্বাচন হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ শুধু নির্বাচন পরিচালনা করা পর্যন্ত। কোনো আইনে বা পদ্ধতিতে হবে, সেটা দলীয় সিদ্ধান্তের ব্যাপার।’এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
