নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) পাম্প মেরামতের নামে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী জামাল হোসেনের বিরুদ্ধে। বেনামি এক উড়ো চিঠির মাধ্যমে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক বরাবর এই অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অর্থ আত্মসাৎ ছাড়াও অধস্তন কর্মকর্তার নামে বরাদ্দকৃত সরকারি কোয়ার্টার ব্যবহার, বিনানুমতিতে বিদেশ ভ্রমণ, অফিসের কাজে ব্যবহৃত মোটরসাইকেল নিজের নামে করে নেওয়া সহ নানান অভিযোগ আনা হয়েছে ঐ চিঠিতে। তবে এসব অভিযোগ মিথ্যা ও প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন অভিযুক্ত প্রকৌশলী।চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্রকৌশলী জামাল হোসেন তার অর্থের প্রয়োজন হলে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নোয়াখালী মৌজা পাম্পের কাজ দেখিয়ে প্রতি অর্থবছরে তার পরিচিত প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ প্রদান করে কাজ না করিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টাকা উত্তোলন করিয়ে নেন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে Old Deep Tubewell water Jetting, Compressor wash, development submersible pump lifting complete installing at NSTU কাজে ১৮ জুন ২০২৩ তারিখে গ্রিন ডট লিমিটেড (এবিএম ওয়াটার কোম্পানি) এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইঞ্জিনিয়ার অশোক কুমার সাহার নামে কার্যাদেশ দেখিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। যার অনুমোদনও নেন ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, কিন্তু বিল দেখানো হয় ২০২২-২৩ অর্থবছরে। উক্ত কাজের জন্য কোন দাপ্তরিক প্রাক্কলন কমিটি দ্বারা প্রাক্কলন ও পিপিআর এর কোন বিধি প্রয়োগ করেননি।চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একটি পাম্প মেরামত ও একটি নতুন পাম্প ক্রয় করার জন্য কার্যাদেশ প্রদান করা হয় ৭ লাখ ৬২ হাজার ২০ টাকায়। কিন্তু ২০২৩ সালে শুধুমাত্র পাম্প ওয়াশ করিয়েই ১০ লাখ টাকা অর্থ উত্তোলন করেন। নোয়াখালী পৌরসভার স্থানীয় একজন ঠিকাদারকে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে পাম্প উত্তোলন এবং পরিষ্কার কাজ করিয়ে নেন।এছাড়া চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়, দ্বিতীয় একাডেমিক ভবন ও লাইব্রেরী ভবনের জন্য লিফট ক্রয়েও অনিয়ম করেন যা দূষণ দমন কমিশনে তদন্তাধীন আছে। লিফট কাজের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে কার্যাদেশ প্রদান করে প্রকৌশলী জামাল হোসেন। সেই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করেন ২০১৭ সালের আনুমানিক এপ্রিল মাসের শেষের দিকে কিংবা মে মাসের প্রথম দিকে তাকে চীন ভ্রমণ করানোর জন্য। উক্ত ভ্রমণের জন্য অনুমতিও নেইনি, যা আজও গোপন রেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিকট। যার পাসপোর্ট নম্বর BC0202906। এমনকি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করেন তাকে উক্ত ভ্রমণে হোটেলে রাত্রি যাপনকালে নারী সরবরাহ করতে। তদন্ত করলে এর প্রমাণ পাওয়া যাবে বলে উল্লেখ করা হয় চিঠিতে।চিঠিতে আরো উল্লেখ করা হয়, প্রকৌশলী জামাল হোসেন অডিটরিয়াম ভবনের জন্য ১৮ লাখ টাকা দিয়ে দুই নম্বর চায়না এসি ক্রয় করেন যার ওয়ারেন্টি-গ্যারান্টিকার্ড প্রদান করেনি। শুধু তাই নয়, প্রকৌশলী জামাল হোসেন নিজ অধস্তন সহকারী প্রকৌশলী জাবেদ হোসেনকে চাপ প্রয়োগ করে জাবেদ হোসেনের নামে সরকারি কোয়ার্টার বরাদ্দ নিয়ে উক্ত বাসায় তিনি এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী বসবাস করেন, যারা দুই জনে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতিসাধন হচ্ছে। সরকারি অফিসের জন্য ক্রয়কৃত তিনটি ওয়াইফাই রাউটার তিনি ইলেকট্রিশিয়ান রফিককে দিয়ে অফিস থেকে খুলে তার ব্যক্তিগত বাসায় নিয়ে যান এবং অফিসের মোটরসাইকেল তিনি উপাচার্য মহোদয়কে দিয়ে তার ব্যক্তিগত নামে লিখিয়ে নেন এবং ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন।তবে এসব অভিযোগ মিথ্যা এবং তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেন প্রধান প্রকৌশলী জামাল হোসেন। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পাম্প ওয়াশের জন্য যে ১০ লাখ টাকা ব্যয় ধরে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে তা যথাযথ নিয়ম মেনেই করা হয়েছে। কার্যাদেশ প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান সে পাম্পটি ওয়াশ করেছে। এক্ষেত্রে অর্থ আত্মসাতের কোন প্রশ্নই আসে না।তিনি আরও বলেন, এক হাজার ফিট গভীর এই পাম্পটি সম্পূর্ণ ওয়াশ করতে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন পড়ে, যার কারণে ব্যয়ও বেশি হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় ঠিকাদার নুর ইসলামের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রথমে চিনতে না পারলেও পরবর্তীতে তিনি স্বীকার করে বলেন, ঐ ব্যক্তিকে দিয়ে আমরা চেষ্টা করেছি অল্প টাকায় কাজ করাতে পারি কিনা। কিন্তু যখন পারি নাই তখন অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হয়েছি।প্রাক্কলন ব্যয় ছাড়া এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ না করে কিভাবে বড় অংকের একটি প্রকল্প পাস হলো জানতে চাইলে বলেন, এটা ইমারজেন্সি কাজ হওয়ার কারণে এবং অর্থবছর শেষের দিকে হওয়ায় আমরা তা করার সময় পাইনি।অফিসের মোটরসাইকেল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভিসি দিদার স্যার এটি আমাকে অফিস থেকে প্রদান করেছেন। আমি নিজের নামে করে নেইনি। বিনানুমতিতে চীন ভ্রমণ প্রসঙ্গে বলেন, আমাকে একজন বলেছিলো যাওয়ার জন্য কিন্তু আমি যাইনি। তখন তৎকালীন ভিসি অহিদুজ্জামান চাঁন ইন্সপেকশেন ইতালি গিয়েছিলেন। আমি যাইনি। প্রধান প্রকৌশলী হয়েও অন্যের নামে বাসায় থাকার কথা স্বীকার করেন তিনি।পাম্প ওয়াশ প্রকল্পে কি কি কাজ করা হয়েছে তা জানতে গ্রিন ডট লিমিটেড নামে ঐ প্রতিষ্ঠানের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।পাম্প ওয়াশের কাজে জড়িত স্থানীয় ঠিকাদার নুর ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ‘২০২৩ সালে অফিসের শিব্বির আহমেদ নামে একজন আমাকে কাজ দেয় পাইপ (লোহার) ওয়াশ করার জন্য। আমি ১১টি পাইপ যা সর্বমোট ১১০-১৩০ ফিট হবে, সেগুলো উঠিয়ে ওয়াশ করে আবার নামিয়ে দিই। প্রতিটি পাইপ বাবদ ২ হাজার টাকা আমাকে ২২ হাজার টাকা প্রদান করা হয়।’ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান বলেন, ‘আমি বেনামি একটি চিঠি পেয়েছি। সেখানে বেশ কিছু বিষয়ে অভিযোগ করা হয়েছে একজন প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। যেহেতু আমাদের কাজ হচ্ছে কোন তথ্য বা ফ্যাক্টস ফাইন্ড করা, সে হিসেবে আমি এই চিঠিটি উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে ফরওয়ার্ডিং করেছি। উনারা এ বিষয়ে কি সিদ্ধান্ত নিবেন বা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিবেন কিনা বলতে পারবেন।’এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
