কিশোরগঞ্জে চোরের অপবাদে যুবককে পেটানোর ঘটনায় আ.লীগ নেতা আব্দুস সালাম (৫৩) কে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শুক্রবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে বৌলাই ইউনিয়নের নাকভাঙ্গা এলাকার কিশোরগঞ্জ-করিমগঞ্জ সড়কের পাশ থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে গত বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) সদর উপজেলার বৌলাই ইউনিয়নে এই ঘটনা ঘটে।গ্রেফতারকৃত আব্দুস সালাম সদর উপজেলার বৌলাই ইউনিয়ন কৃষক লীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহ সাধারণ সম্পাদক।জানা যায়, গত মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে বৌলাই ইউনিয়নের পুরান বৌলাই গ্রামে আব্দুল কদ্দুসের ছেলে সজল মিয়ার বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটে। এসময় সন্দেহজনক একই এলাকার সোহরাব উদ্দিন ও এরশাদ মিয়াকে ভুক্তভোগীর বাড়ির পাশ থেকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে ওইদিন রাতে স্থানীয় গ্রাম্য মাতব্বরদের মধ্যস্থতায় সমাধান করে তাদের সহায়তায় অভিযুক্ত সোহরাব উদ্দিন ও এরশাদ মিয়াকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে পরেরদিন বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে আবারও গ্রাম্য শালিশ ডেকে তাদের উপর অত্যাচার নির্যাতন করা হয়। এসময় তাদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে চুতরা পাতা লাগানো, কঞ্চি দিয়ে বেত্রাগাত, লাঠি দিয়ে পেটানো, কিল-ঘুষি দেওয়া হয়। অবশেষে জনসমক্ষে বেত্রাগাত করা হয়। শুধু তাই নয়, দুইজনকে এক লাখ টাকা আর্থিক জরিমানা করা হয়েছে। পরিশোধের জন্য ১৫ দিন সময় বেঁধে দেন আব্দুস সালাম।ধারণ করা ২ মিনিট ৩০ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, বৌলাই ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সালাম এরশাদ মিয়াকে কঞ্চি দিয়ে বেত্রাগাত করছেন। কিন্তু এরশাদ মিয়া বার বার এদিকে কখনও আসেননি বলে সালামের কাছে আকুতি করছেন। এরশাদ মিয়া আল্লাহর কসম খেয়ে পায়ে হাত রেখে বার বার বলে যাচ্ছেন, ‘আমি এদিকে আসেনি। আমি আর পরশ ভাই বাগানে বসেছিলাম। আমি তো এখন এখানে বসে আছি, আপনারা পরশ ভাইকে আলাদা গিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। সেতো আর বানিয়ে বলতে পারবে না। তারে গিয়ে একটু জিজ্ঞেস করেন। এখানে শুধু আমি আর পরশ ভাই বসেছিলাম। প্রথম আমি (এরশাদ মিয়া), পরশ ও সোহরাব উদ্দিন আমাদের ঘরের বারান্দায় বসে মোবাইল চালিয়েছি। পরে সোহরাব উদ্দিন সাবেক মেম্বার লালু কাকার সাথে চলে আসে। এসময় গ্রাম্য শালিশে আহত অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যায় সোহরাব উদ্দিনকে। পরে আব্দুস সালাম গ্রাম্য শালিশে রায় ঘোষণা করে বলেন, ‘আমি তাদের গার্জেনের (অভিভাবক) সাথে কথা বলেছি। এরশাদ মিয়া দিবে ৫০ হাজার ও সোহারাব উদ্দিন দিবে ৫০ হাজার টাকা। আগামী ১৮ তারিখের মধ্যে টাকা গুলো সজল মিয়াকে দিয়ে দিতে হবে।’চুরির অপবাদে অভিযুক্ত সোহরাব উদ্দিন বলেন, ‘আমার অনেকদিন ধরে মাছ ধরার নেশা। ওইদিন রাত আনুমানিক ৩টা বাজে সাবেক মেম্বার হাছান রাব্বানী লালু’র সাথে মাছ ধরতে যায়। সজলদের বাড়ির পাশে একটা ব্রীজ আছে, সেটা পার হয়ে যাওয়ার পর শুনতে পায় পাশের বাড়ির লোকজন চিৎকার কর বলছে চোর আসছে। চিৎকার শুনে মেম্বার ও আমি দুইজন ওইখানে যাই এবং চোর খুঁজতে বের হয়। একপর্যায়ে আমাকে চোর বলতেছে। আমি মেম্বারকে নিয়ে তাদের বাড়িতে যাই, এসময় সজলের ভাই স্বপন আমাকে শার্টের কলারে ধরে মারধর করে। পরে মেম্বার আমাকে বাঁচিয়ে তার বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে আমি বাড়িতে চলে আসি। বুধবার সকালে আবার আমাকে গ্রাম্য শালিশে যাওয়ার জন্য ডাকলে আমি যাওয়া মাত্র শার্টের কলারে ধরে বাড়িতে নিয়ে টর্চার করে। আমাকে চোর বলে আমার শরীরে আঘাত করা হয়। লাঠি দিয়ে পিঠিয়েছে, চুতরা গাছ দিয়ে পিঠিয়েছি, কিল ঘুষি তো আছেই। আর এরশাদ ছিল আলাদা। এরশাদকেও বাহির থেকে আনা হয়। আমি এই ঘটনার বিচার চাই।’সাবেক মেম্বার হাছান রাব্বানী লালু বলেন, ‘সোহরাবকে শুধু শুধু চোরের অপবাদ দেওয়া হয়েছে। আমি রাতে জাল দিয়ে কিংবা লাইটের আলো দিয়ে মাঝে মাঝে মাছ ধরি। সে আমার সাথে মাছ ধরতে এসেছিল। এসময় সজলের ভাই স্বপন নিজেও আমার সাথে তাকে (সোহরাব) দেখেছে, বাড়ির পাশে ব্রীজের উপর তার সাথে দেখা হয়েছে। চোর আসছে শুনে আমি ও সোহরাব দুজন মিলে আমার বাড়ি থেকে সজলদের বাড়িতে যাই। সেখানে যাওয়ার পর মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাকে মারধর করা হয়েছে। পরেরদিন দরবারের কথা বলে এনেও তাকে মারধর করা হয়েছে। কাজটি মুঠেও ঠিক করেনি। চোরের অপবাদ দিয়ে জরিমানাও করা হয়েছে।’অভিযোগের বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার (৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে পুরান বৌলাই এলাকায় গেলে সজলের লোকজন গাড়ী থামিয়ে সাংবাদিকদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে নিষেধ করে। এবং বিষয়টি নিয়ে কোন কথা বলবে না জানিয়ে রাস্তা থেকে চলে আসতে বাধ্য করা হয়।এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সালাম বলেন, ‘সজল মিয়ার ঘর থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ও ২টি মোবাইল চুরি হয়েছে। অভিযুক্ত এরশাদ মিয়াকে সালাম তার আত্মীয় দাবি করেন। সেজন্য তাকে শাসন করেছেন। তাতে তার (আব্দুস সালাম) সাজা হলে হবে বলে জানান। অভিযুক্তদের দরবারে চোর হিসেবে প্রমাণ করতে পারলেন কি? এমন প্রশ্নের কোন সদুত্তর দিতে পারেননি আব্দুস সালাম। বিষয়টি নিয়ে আবারও সজলের সাথে কথা বলবেন বলে জানান।’কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, চুরির অপবাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতার যুবককে পিটানোর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এরপর তাকে আজ বিকেলে বৌলাই নাকভাঙ্গা এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। যাচাই-বাচাই শেষে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
