যশোরের গাইনী বিভাগের অধ্যাপক ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার বিকল্প পদ্ধতিতে রক্তপাত ছাড়াই সেন্ট্রাল প্লাসেন্টা প্রিভিয়া অস্ত্রোপচার করে সফলতার নতুন রেকর্ড গড়েছেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তিনি এই পদ্ধতিতে অস্ত্রোপচার করেন। যিনি জন্মগতভাবে দুটি জরায়ু নিয়ে এসেছিলেন, একটি ব্লকড জরায়ুর অস্ত্রোপচারে সাফল্য অর্জন করে চমক দেখিয়েছেন। এছাড়া, গরিব রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান ও অপারেশন করে মানবিকতার পরিচয় দিচ্ছেন এই চিকিৎসক।জানা গেছে, সেন্ট্রাল প্লাসেন্টা প্রিভিয়া নাম শুনলেই গাইনী বিভাগের চিকিৎসকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। প্লাসেন্টা প্রিভিয়া গর্ভবতী নারীদের মধ্যে বিকাশ হওয়া একটি বিরল মেডিকেল অবস্থা। এ ধরনের রোগীর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করতে চিকিৎসকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, কারণ এ ধরনের অস্ত্রোপচারের জন্য ২০ ব্যাগেরও বেশি রক্তের প্রয়োজন হয় এবং মৃত্যুঝুঁকি থাকে। তবে, বিকল্প পদ্ধতিতে রক্তপাত ছাড়াই যশোর শহরের নীলগঞ্জ তাঁতিপাড়ার টনি মাহমুদের স্ত্রী মনিরা খাতুনের (২৬) অস্ত্রোপচার করে সাফল্য অর্জন করেন ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার।ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদারের নিজস্ব অভিজ্ঞতায় সুস্থ জীবন পেয়েছেন নড়াইল পৌরসভার ভওয়াখালী এলাকার আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী নাজমা বেগম (৪০)। খুলনা-ঢাকার অনেক চিকিৎসক দেখালেও তিনি সমস্যার সমাধান পাননি। দেড় বছরের বেশি সময় যন্ত্রণা ভোগ করার পর নাজমা বেগম ডা. নিকুঞ্জ বিহারীর কাছে আসেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক নিশ্চিত হন যে রোগী পিপিএইচ সমস্যায় ভুগছেন, ফলে তার রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছিল না। ডা. নিকুঞ্জ তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে রোগীর অস্ত্রোপচার করেন এবং এতে সফলতা মেলে।ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মাহাবুব হোসেনের স্ত্রী নীরা বেগম (২৫) বিকল্প পদ্ধতিতে রক্তপাত ছাড়াই অস্ত্রোপচার করে সফলতার রেকর্ড গড়েন ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার। এছাড়া, নড়াইল পৌরসভার ভওয়াখালী এলাকার আশরাফুল ইসলামের স্ত্রী নাজমা বেগম (৪০), নড়াইল সদর উপজেলার বেনহাটি গ্রামের আনন্দ বিশ্বাসের স্ত্রী বিভাবতী (৫০), যশোর পুলিশ লাইন এলাকার স্বপন মিয়ার স্ত্রী রুমানা বেগম (৩৮), সদর উপজেলার কিসমত নওয়াপাড়ার এক কিশোরী (১৪), শার্শা উপজেলার বারপোতা গ্রামের কৃষক নুরুল ইসলামের স্ত্রী ফাতেমা বেগম (৩০), চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার মোস্তজাপুর গ্রামের ফারুক হোসেনের স্ত্রী সোনালী খাতুন (২৭), বাঘারপাড়া উপজেলার রায়পুর গ্রামের আব্দুল আলিমের স্ত্রী মনিরা খাতুন ওরফে বিউটি (৩৬), ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার বারুইহুদা গ্রামের আব্দুস সোবহানের স্ত্রী আমেনা খাতুন (৪৫) সহ অনেক রোগীর জটিল অস্ত্রোপচারে হাসি ফুটিয়েছেন ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার।এদিকে, যশোর শহরের ঘোপ নওয়াপাড়া রোডের মৃত ইকরামুল ইসলামের মেয়ে মিলা ইসলামের (৪০) জটিল অস্ত্রোপচারে সাফল্য পান মানবিক চিকিৎসক ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার। রোগীর স্বজনরা জানান, অবিবাহিত মিলা ইসলামের তলপেট ক্রমেই বড় হতে থাকে। বিষয়টি পরিবারের লোকজন আমলে নেননি। প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হলে তাকে ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদারের কাছে নিয়ে আসা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক নিশ্চিত হন যে মিলার জরায়ুতে বড় ধরনের টিউমার হয়েছে। চিকিৎসক ঝুঁকি নিয়ে মিলার জরায়ুতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ১৫ কেজি ওজনের টিউমার বের করেন।এর আগে, কিসমত নওয়াপাড়া গ্রামের কিশোরী শিরিনা আক্তার (ছদ্মনাম) দশম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছিল। সে দুটি জরায়ু নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সমস্যা দেখা না দিলেও বয়ঃসন্ধিকালে যন্ত্রণা শুরু হয়। ব্লকড থাকা জরায়ু দিয়ে মাসিক বের হতে না পেরে সীমাহীন যন্ত্রণা ভোগ করতে হচ্ছিল। স্বাভাবিক ব্যথা মনে করে যশোর, খুলনা ও ঢাকার চিকিৎসকদের কাছে ছুটেছেন, কিন্তু চিকিৎসাসেবায় কোনো কাজ হয়নি। হতাশ হয়ে স্বজনরা কিশোরীকে নিয়ে যান এক শিশু চিকিৎসকের কাছে। তার পরামর্শে কিশোরীকে ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদারের কাছে নেয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডা. নিকুঞ্জ বিহারী তার অস্ত্রোপচার করেন। কিশোরীর ভাই জানান, তার বোন এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে।রোগী মনিরা খাতুনের স্বামী টনির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ওই সময় তার স্ত্রী (মনিরা) গর্ভবতী হওয়ার পর একাধিক গাইনী সার্জনের কাছে চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। সেন্ট্রাল প্লাসেন্টা প্রিভিয়া হওয়ার পর চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারে কেউ ঝুঁকি নিতে চাননি। কিন্তু মানবিক ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদারের অস্ত্রোপচারে স্ত্রী ও সন্তান দু’জনই ভালো আছেন।অধ্যাপক ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদার জানান, প্লাসেন্টা প্রিভিয়া একটি মারাত্মক জটিল অবস্থা। সাধারণত গর্ভবতী নারীদের জরায়ুর ওপরে গর্ভফুল থাকে। কিন্তু প্লাসেন্টা প্রিভিয়া হলে ফুলটি নিচের দিকে চলে এসে জরায়ুর মুখে লেগে থাকে, যা রোগীর জন্য অত্যন্ত বিপদজনক হয়ে ওঠে। অস্ত্রোপচার করাও তুলনামূলকভাবে অধিক ঝুঁকিসম্পন্ন। সন্তান প্রসবের সময় মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে, কারণ যখন সার্ভিক্স খোলে তখন এটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্লাসেন্টা হলে জরায়ু প্রস্রাবের থলির মধ্যে লেগে থাকে, ফলে রোগীর মারাত্মক রক্তপাত ঘটে, যা শিশুকেও প্রভাবিত করে। বিকল্প পদ্ধতি প্রয়োগে রক্তপাতবিহীন রোগীর অস্ত্রোপচারে সফলতা এসেছে। তিনি আরও জানান, দুটি জরায়ু নিয়ে জন্ম নেয়া কিশোরীর সমস্যার বিবরণ শুনে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়। ফলাফলে তার ধারণার মিলও পান। দুটি জরায়ুর মধ্যে একটি ব্লকড অবস্থায় ছিল। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি জটিল সমস্যার সমাধান করেন। এমন জটিল অস্ত্রোপচার সফলতায় তিনি গর্বিত ও সম্মানিত।প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ১১ জুলাই যশোরে প্রসবকালীন ও প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ প্রতিকার ও প্রতিরোধে (প্লাসেন্টা প্রিভিয়া উইথ পাক্রিয়েটা) অধ্যাপক ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদারের বিকল্প পদ্ধতির সফলতা বিষয়ে বৈজ্ঞানিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠন অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) যশোর জেলা শাখা এই বৈজ্ঞানিক সম্মেলনের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে ডা. নিকুঞ্জ বিহারী গোলদারকে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।পিএম
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
