কক্সবাজারের উখিয়ায় অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এখন আর কেবল মানবিক আশ্রয়কেন্দ্র নয়, দিন দিন এগুলো অপরাধ ও অস্থিতিশীলতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। হত্যাকাণ্ড, মাদকপাচার, অপহরণ, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের লড়াইসহ নানান মুখী অপরাধ ঘটছে রোহিঙ্গা শিবিরে।ফলে ক্যাম্পের ভেতরে যেমন অশান্তি বিরাজ করছে, তেমনি আশপাশের এলাকায় বসবাসরত স্থানীয়দের মাঝে ভয়-আতঙ্ক বেড়েই চলেছে। পার্শ্ববর্তী এলাকার সাধারণ মানুষজন এসব ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করছেন।জানা গেছে, ক্যাম্পগুলো এখন ‘মাদকের হটস্পটে’ পরিণত হয়েছে। শুধু ক্যাম্প এলাকাতেই চার শতাধিক মাদক বিক্রি ও সেবনের আস্তানা গড়ে উঠেছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। সীমান্তজুড়ে ১৯টি পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত প্রবেশ করছে ইয়াবা, আইস ও নানা ধরণের মাদক। আরাকান আর্মির অর্থায়ন ও নিয়ন্ত্রণেই এসব মাদক ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে বলে গোয়েন্দা সংস্থা সহ অনেকেই মন্তব্য করতে দেখা যায়।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সক্রিয় রয়েছে অন্তত ৬টি বড় গ্রুপ এবং একাধিক উপগ্রুপ। এছাড়া, সাম্প্রতিক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ৫টি জঙ্গি সংগঠনের সক্রিয়তার তথ্য। এর মধ্যে রয়েছে আরসা, আরএসও, আরাকান রোহিঙ্গা আর্মি (এআরএ) ও ইসলামী মাহাজ। আরসা ও আরএসওর মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত ক্যাম্পগুলোকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে বলে একাধিক সাধারণ রোহিঙ্গার অভিযোগ।ক্যাম্পে দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধের মাত্রা প্রতিনিয়ত ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে, যা নিয়ন্ত্রণে আনতে নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি বিশেষ তৎপরতা চালানো হচ্ছে।তাদের অপরাধ দমনে নানা অপরাধে ৪ হাজার ৫৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ৯ হাজার ৩৩ জন। মামলা না হওয়া বহু অপরাধ হারিয়ে যায় ক্যাম্পের গলিপথে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ২৬৩টি, মাদক মামলা ২ হাজার ৫৮৯টি, অস্ত্র মামলা ৪১৮টি, ধর্ষণ মামলা ১৪৫টি, অপহরণ মামলা ৯৩টি, মানবপাচার মামলা ৫৫টি এবং অন্যান্য ৪৩২টি।আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে আরো জানা গেছে, শুধু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্তই ২৫০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা ১৮টি, মাদক ১৫০টি, অপহরণ ৫০টি এবং ধর্ষণ মামলা ১২টি। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ঢলের পর থেকে এ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হয়েছে ২৮৭টি মামলা। এ সময়ে খুন হয়েছেন অন্তত ৩০০ রোহিঙ্গা।বিজিবির তথ্য বলছে, গত এক বছরে কক্সবাজার রিজিয়ন থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ২ কোটি ৩৩ হাজার ৯৪৯ পিস ইয়াবা, ১৪০ কেজি আইস, ২৫ কেজির বেশি হেরোইন, কোকেন, গাঁজা ও বিপুল পরিমাণ বিদেশি মদ। গড়ে প্রতিদিন উদ্ধার হচ্ছে প্রায় ৫৫ হাজার ইয়াবা। মাদকবিরোধী অভিযানে ধরা পড়া পাচারকারীদের ৮০ শতাংশই রোহিঙ্গা।এদিকে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) দেওয়া তথ্যমতে, বর্তমানে কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৪ লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে ৮ লাখ এসেছে ২০১৭ সালের আগস্টের পর এবং শুধু ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেড় লাখ রোহিঙ্গা নতুন করে ঢুকছে। এদের মধ্যে নিবন্ধিত হয়েছে ১ লাখ ২১ হাজার, বাকিরা রয়েছেন অনিবন্ধিত।প্রতিবছর ক্যাম্পে জন্ম নিচ্ছে প্রায় ৩০ হাজার শিশু, অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে ৮৭ জন। ফলে জনসংখ্যার চাপ ক্রমেই বাড়ছে। তবে আট বছরেও একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। এতে বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আর্থ-সামাজিক চাপ।স্থানীয় ও অনেক সচেতন মহল বলছে, ১৪ লাখ রোহিঙ্গার হিসাব থাকলেও বাস্তবচিত্রে ২০ লাখেরও বেশি মিয়ানমার নাগরিক বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে বসবাস করছে।অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী জানান, ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে যৌথভাবে কাজ করছে বিভিন্ন সংস্থা। বিশেষ করে মাদক নিয়ন্ত্রণে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। তবে অপরাধ চক্র ও জঙ্গি সংগঠনের দৌরাত্ম্য থামাতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।এআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
