চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের ব্যস্ত উপজেলা সাতকানিয়া। এখানে দিন দিন বাণিজ্যিক ও সেবামূলক ব্যবসা বাড়ছে। বাজারগুলোয় এখন চোখে পড়ে অসংখ্য সাইনবোর্ড—‘মডার্ণ ডেন্টাল কেয়ার’, ‘মিজান’স ডেন্টাল’, ‘জননী ডেন্টাল’—প্রায় সবগুলোতেই লোভনীয় বিজ্ঞাপন: ব্রেস লাগানো, দাঁত ফর্সা করা, দাঁত তোলা, রুট ক্যানেল—সবকিছু সাশ্রয়ী দামে! কিন্তু এই ঝকঝকে সাইনবোর্ডের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর এক বাস্তবতা।বুধবার (২৭ আগস্ট) রাতে সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসনের এক মোবাইল কোর্ট অভিযানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ৪টি ডেন্টাল ক্লিনিক পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ২টির ডাক্তারদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডেন্টাল ডিগ্রি নেই। একজন ডিপ্লোমা পাস। তাদের সহকারীরাও অষ্টম শ্রেণির বেশি পড়েননি।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরো উপজেলায় ৫০টির বেশি ডেন্টাল ক্লিনিক সক্রিয়। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটিরই বিএডিএস (ব্যাচেলর অব ডেন্টাল সার্জারি) ডিগ্রিধারী ডাক্তার আছেন। বাকিগুলো পরিচালনা করছেন নানা শিক্ষাগত যোগ্যতার লোকজন। অনেকেই অন্য কাজ করতেন, হঠাৎ দাঁতের ডাক্তার সেজে বসেছেন।ভুয়া দন্ত চিকিৎসকের সবচেয়ে বড় শিকার গরিব মানুষ। ৪৫ বছর বয়সী রহিমা খাতুন, সাতকানিয়া পৌর এলাকার বাসিন্দা। দুই বছর আগে দাঁতের ব্যথায় ভুগছিলেন। পাশের বাজারে একটি ডেন্টাল ক্লিনিকে যান। ৩শ’ টাকায় দাঁত তুলবেন বলে আশ্বাস দেন চিকিৎসক। দাঁত তোলার সময় প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হয়। ব্যথায় অজ্ঞান হয়ে যান রহিমা। পরে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। ডাক্তাররা জানান, সঠিকভাবে যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত না করায় সংক্রমণ হয়েছে। দাঁতের ক্ষতস্থান ফুলে গিয়ে মুখের অর্ধেকটা বিকৃত হয়ে গেছে।রহিমা কেঁদে বলেন, গরিব মানুষ শহরে গিয়ে ডাক্তার দেখাবো কীভাবে? গ্রামের ক্লিনিকটা সস্তা ছিল, তাই গিয়েছিলাম। এখন মুখটাই নষ্ট হয়ে গেছে।রহিমার মতো অসংখ্য মানুষ ভুয়া চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় আক্রান্ত। কেউ স্থায়ী দাঁত হারাচ্ছেন, কেউ মারাত্মক সংক্রমণে জীবন-মৃত্যুর লড়াই করছেন।ডেন্টাল চিকিৎসা খুবই সূক্ষ্ম এবং ঝুঁকিপূর্ণ। দাঁতের ভেতর রক্তনালী ও স্নায়ু থাকে। ভুল চিকিৎসায় স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে ব্যথা সারাজীবনের জন্য থেকে যেতে পারে। সংক্রমণের ঝুঁকি তো রয়েছেই।ডেন্টাল চিকিৎসায় জীবাণুমুক্ত যন্ত্রপাতি ব্যবহার বাধ্যতামূলক। দাঁত তোলা বা ফিলিং করার সময় সামান্য অসাবধানতায় হেপাটাইটিস বি, সি বা এইচআইভির মতো ভাইরাস ছড়াতে পারে। অথচ ভুয়া চিকিৎসকেরা এসবের কিছুই জানেন না, মানেন না।সাতকানিয়ার ডেন্টাল ক্লিনিকগুলোয় যন্ত্রপাতি জীবাণুমুক্ত করার জন্য অটোক্লেভ মেশিন নেই। যেসব যন্ত্র ব্যবহার করা হয়, সেগুলো বারবার ধুয়ে মুছে আবার রোগীর মুখে প্রবেশ করানো হয়। এই অব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়ঙ্কর হুমকি।প্রশ্ন জাগে, এত ডেন্টাল ক্লিনিক কীভাবে গজিয়ে উঠছে? অনুসন্ধানে জানা গেছে কয়েকটি কারণ—নিয়মিত অভিযান না হওয়ার ফলে ভুয়া চিকিৎসকেরা বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। শহরের স্বীকৃত দন্ত চিকিৎসকের কাছে গেলে দাঁত তোলার খরচ ১৫০০–২০০০ টাকা। গ্রামে ভুয়া ডাক্তাররা মাত্র ২০০–৩০০ টাকায় কাজ করে দেয়। গরিব মানুষ ঝুঁকি না জেনে সস্তার চিকিৎসা নেন। গ্রামের মানুষ বোঝেন না বিএডিএস ডিগ্রির গুরুত্ব। দাঁতের চিকিৎসকের সাইনবোর্ড দেখলেই মনে করেন ডাক্তার। অনেক ভুয়া ক্লিনিক মালিক স্থানীয় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত। তাই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনও ভয় পায়।বুধবার (২৭ আগস্ট) রাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে মোবাইল কোর্টে ৪টি ক্লিনিক পরিদর্শন করা হয়। ৩ ক্লিনিকের মালিককে জরিমানা করা হয়, এর মধ্যে দুটি ক্লিনিক সিলগালা করা হয়।বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইন অনুযায়ী, বিএডিএস ডিগ্রিহীন কেউ দাঁতের চিকিৎসা দিতে পারবেন না। এটি ফৌজদারি অপরাধ। আইন লঙ্ঘন করলে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু বিএমডিসির কোনো মাঠপর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থা নেই। আইন প্রয়োগের দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসনের। আর এই সুযোগেই ভুয়া চিকিৎসকেরা বেপরোয়া।সাতকানিয়ায় ভুয়া দন্ত চিকিৎসার শিকার মানুষের প্রকৃত সংখ্যা জানা না গেলেও স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের এক তৃতীয়াংশই কোনো না কোনো সময় ভুল চিকিৎসার শিকার হয়েছেন বলে চিকিৎসকরা জানান।কেউ দাঁত তুলতে গিয়ে মুখের হাড় ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। কারও দাঁতের ব্যথা না কমে মুখে পুঁজ হয়ে গেছে। কেউবা নকল ব্রেস লাগানোর ফলে দাঁত একেবারে বেঁকে গেছে।১৬ বছরের স্কুলছাত্রী জান্নাত আক্তার বলেন, শুনেছিলাম ব্রেস লাগালে দাঁত সুন্দর হবে। ক্লিনিকের ডাক্তার ৮ হাজার টাকা নিলেন। কয়েক মাস পর দাঁতের মাড়ি পচে গিয়ে সব দাঁত ঢিলে হয়ে যায়। এখন মুখ লুকিয়ে থাকি।বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাধানের জন্য প্রয়োজন—নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, ভুয়া ক্লিনিক সিলগালা করে মালিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, জনগণকে সচেতন করা—বিএডিএস ডিগ্রিহীন কারও কাছে চিকিৎসা নিলে ঝুঁকি আছে ও গ্রামে স্বল্পমূল্যে সরকারি দন্ত চিকিৎসা সেবা চালু করা।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়া কেউ চিকিৎসা কার্যক্রম চালাতে পারবে না। এসব ভুয়া ডেন্টিস্টদের কারণে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান বাড়ানো হবে।এইচএ
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
