কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অতিরিক্ত জনচাপ এখন স্থানীয়দের নিত্যদিনের দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। সকাল-বিকেল কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের চলাচলে দেখা দিয়েছে সীমাহীন ভোগান্তি। এতে এলাকাজুড়ে নানামুখী সমস্যা সৃষ্টি হয়ে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয়রা।জানা গেছে, উখিয়া উপজেলার ২৬১.৮০ বর্গকিমি আয়তনে রোহিঙ্গাসহ মোট জনসংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। স্থানীয়দের সংখ্যা মাত্র আড়াই লাখ। তবে অনেকেই মনে করছেন, রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১৬ লাখেরও বেশি হতে পারে, কারণ এখনো অনেক রোহিঙ্গা সরকারি রেজিস্ট্রার্ড হয়নি।সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উখিয়া উপজেলার পালংখালী, থাইংখালী, জামতলী, ময়নারঘোনা, বালুখালী, শিয়ালিয়াপাড়া, কুতুপালং, লম্বাশিয়া, মধুরছড়া, উখিয়া সদরসহ একাধিক গ্রাম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চাপে স্থানীয় বাসিন্দারা নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত।উখিয়া উপজেলার বৃহত্তর এই এলাকাগুলো রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পার্শ্ববর্তী হওয়ায় বেশিরভাগ তাদের দৈনন্দিন জীবনে সর্বত্র ব্যাঘাত ঘটে আসছে।ঐ গ্রামের লোকজনের ভাষ্যমতে, তারা এখন নিরাপদে বসবাসের পরিবেশ হারিয়ে ফেলেছেন। চাষাবাদের জমি পরিণত হয়েছে পচা নালায়। জরুরি প্রয়োজনে কোথাও যেতে হলে যানজটের কারণে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। সবসময় আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে তাদের।অনিরাপদ বসবাসরোহিঙ্গা ক্যাম্পের পার্শ্ববর্তী এলাকায় স্থানীয়রা নিরাপদে বসবাস করতে পারছেন না। অতিরিক্ত জনচাপের সঙ্গে সঙ্গে ক্যাম্পের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আধিপত্য বিস্তারের জন্য খুন, হত্যা, গুম ও অপহরণের মতো নৃশংস ঘটনা নিয়মিত ঘটে আসছে। গত সোমবার (১৮ আগস্ট) এক যুবককে গলা কেটে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে কুতুপালং বাজার থেকে ১৫ বছরের এক কিশোরকে অপহরণ করে মারধর ও গলায় সাকো লাগিয়ে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। এই ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে আসছে। ফলে এলাকায় নিরাপদে বসবাস ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্বে থাকা এপিবিএন পুলিশ জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গারা অনেক দিক থেকে শৃঙ্খলাহীন আচরণ করে। এই পরিস্থিতিতে তাদের নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এপিবিএন পুলিশ।সড়কে যানজটউখিয়ার সড়কে অতিরিক্ত যানবাহন এবং জনচাপে নিয়মিত যানজট লেগেই থাকে। স্থানীয়দের যাতায়াত ব্যবস্থা চরম ভোগান্তিতে। জরুরি কাজে কোথাও যেতে হলে নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ফলে স্থানীয়দের চলাচলে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে এবং দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে।উখিয়া শাহপুরী হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সাইফুল ইসলাম সময়ের কন্ঠস্বরকে জানিয়েছেন, সড়কে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অতিরিক্ত চাপ রয়েছে। বিশেষ করে কুতুপালং কেন্দ্রিক এলাকায় যানজট বেশি হয়। তবে, পুলিশের টিম যানজট নিরসনে নিয়মিত সড়কে অবস্থান করে বলেও জানান তিনি।পচা বর্জ্যে আবাদি জমি অনুপযোগীরোহিঙ্গা ক্যাম্পের পার্শ্ববর্তী এলাকার স্থানীয়দের একমাত্র ভরসা চাষাবাদের জমিগুলো এখন আর আবাদযোগ্য নেই। রোহিঙ্গাদের ফেলা বর্জ্যে এসব জমি পরিণত হয়েছে পরিত্যক্ত পচা-বনে। চাষাবাদ করলেই পচা-ময়লার স্তুপে ফসল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।একাধিক কৃষকের অভিযোগ, জমি আবাদ অযোগ্য হয়ে পড়ায় জীবিকা নির্বাহে তারা চরম সংকটে পড়েছেন।উখিয়ার কৃষি-উপ সহকারী মাহমুদুল হক তারেক সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেছেন, কুতুপালং, বালুখালী, পালংখালীসহ কয়েকটি গ্রামের জমি চাষাবাদে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। তবে, এগুলোর ব্যবস্থায় নালা তৈরি হওয়ার কথা শুনেছিলাম। কার্যকর কতটুকু জানা নেই।স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কারণে উখিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্যাম্পের আশপাশের জমিগুলোতে ময়লা-আবর্জনার কারণে চাষাবাদ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তাঘাটে তাদের বেপরোয়া চলাফেরার ফলে নিয়মিত সৃষ্টি হচ্ছে যানজট, সময়মতো কর্মজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের গন্তব্যে পৌঁছানো হয়ে উঠছে কষ্টসাধ্য।শুধু তাই নয়, বাজার-ঘাটেও রোহিঙ্গাদের অতিরিক্ত ভিড়ে স্থানীয়রা পড়ছে চরম দুর্ভোগে। সর্বত্র এই বিশাল জনগোষ্ঠীর অবাধ বিচরণের কারণে এখানকার মানুষ অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে।উখিয়ার পরিবেশবাদী জসিম আজাদ বলেছেন, যেখানে একসময় ছিল শান্ত-সবুজে ঘেরা মনোরম পরিবেশ, সেখানে এখন রোহিঙ্গাদের ঘনবসতির কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ক্রমে স্থানীয়দের বসবাসযোগ্য পরিবেশও নানা সমস্যার মুখে পড়ছে।অনেকেই বলছেন, রোহিঙ্গারা কাঁটাতারের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকলে উখিয়ার পরিবেশ ও জীবনযাত্রা এতটা বিপর্যস্ত হতো না। ক্যাম্পের ভিতরে কাঁটাতার এবং চেকপোস্ট বসিয়েছে ঠিকই কিন্তু কাজের বেলায় এসব রেজাল্ট জিরো।১৪ এপিবিএন পুলিশের অধিনায়ক সীরাজ আমিন ও ৮ এপিবিএন পুলিশের অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রোহিঙ্গারা সরাসরি চেকপোস্ট পার হওয়ার সুযোগ পান না। তবে তারা খুবই খারাপ প্রকৃতির এক অজ্ঞ গোষ্ঠী। তারা কাঁটাতার পার হয়েই বেশিরভাগ বাহিরে চলে যায়। অনেক সময় চেকপোস্টে বিভিন্ন ফাকিবাঁজি করেও বের হয়।রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হেলাল উদ্দিন সময়ের কন্ঠস্বরকে জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের কারণে সৃষ্টি হওয়া ভোগান্তির চেয়ে আতঙ্কই বেশি বাড়ছে। তারা নিয়মিত একের পর এক নৃশংস ঘটনা ঘটাচ্ছে। সাধারণ মানুষকে পথে-ঘাটে ভোগান্তির চেয়ে আতঙ্কজনক পরিস্থিতির বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা জরুরি।পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ গফুর উদ্দিন সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেছেন, দেশের অন্যান্য উপজেলার তুলনায় উখিয়ায় জনসংখ্যার চাপ অনেক বেশি। ছোট্ট আয়তনের এই উপজেলার উপর অস্বাভাবিক জনসংখ্যার বোঝা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বাজার ব্যবস্থা, যাতায়াত ব্যবস্থা ও প্রাকৃতিক পরিবেশসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে জটিল সংকট। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এসব সমাধানের একমাত্র পথ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন।এইচএ

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
২৫০ আসনে গ্রিন সিগন্যাল দিচ্ছে বিএনপি
২৫০ আসনে গ্রিন সিগন্যাল দিচ্ছে বিএনপি

দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ২৫০টি আসনে প্রার্থী মনোনয়নের গ্রিন সিগন্যাল দিতে যাচ্ছে বিএনপি। দলের হাইকমান্ড জানিয়েছে, অধিকাংশ আসনে প্রার্থী Read more

‘জুলাই হত্যার বিচার দ্রুত করতে বাড়তে পারে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা’
‘জুলাই হত্যার বিচার দ্রুত করতে বাড়তে পারে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা’

জুলাই হত্যার বিচার দ্রুত করতে ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের Read more

হৃদয়ে পবিত্র কুরআন, মাথায় সম্মানের তাজ: বিরামপুরে ৬ হাফেজকে পাগড়ী প্রদান
হৃদয়ে পবিত্র কুরআন, মাথায় সম্মানের তাজ: বিরামপুরে ৬ হাফেজকে পাগড়ী প্রদান

মায়ের চোখের কোণে আনন্দাশ্রু, আর বাবার বুকে গর্বের হাহাকার—বিরামপুরের শালবাগান এলাকার আকাশ-বাতাস যেন আজ এক অপার্থিব প্রশান্তিতে ছেয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ Read more

৪ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করছেন প্রধান উপদেষ্টা
৪ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করছেন প্রধান উপদেষ্টা

চারটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার (২২ জুলাই) রাত ৯টায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন Read more

গাজায় ৩০ হাজার তরুণ যোদ্ধা নিয়োগ, হাল ছাড়ছে না হামাস
গাজায় ৩০ হাজার তরুণ যোদ্ধা নিয়োগ, হাল ছাড়ছে না হামাস

হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জউদ্দিন আল-কাসসাম ব্রিগেড গাজার প্রায় ৩০ হাজার তরুণকে তাদের দলে যোগদানের জন্য নিয়োগ করেছে। রোববার (২০ এপ্রিল) এক Read more

গজারিয়ায় ২ চাঁদাবাজকে গাঁজাসহ পুলিশে দিলো স্থানীয়রা
গজারিয়ায় ২ চাঁদাবাজকে গাঁজাসহ পুলিশে দিলো স্থানীয়রা

মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় হোসেন্দী ইউনিয়ন ডুবাচর গ্রাম সংলগ্ন নদী থেকে চাঁদাবাজির পর নিজেদের মধ্যে টাকা ভাগাভাগির সময় গাঁজাসহ ২ চাঁদাবাজকে আটক Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন