শরীয়তপুরে একটি অসুস্থ নবজাতক দ্রুত ঢাকা নেওয়ার পথে স্থানীয় অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বাধার কারণে প্রাণ হারায়। এ ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে জেলা জুড়ে। শিশুটির মৃত্যুর মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত সবুজ দেওয়ানকে র্যাব ও পুলিশ যৌথ অভিযানে গ্রেফতার করেছে।শনিবার (১৬ আগস্ট) ভোররাতে সদর উপজেলার বেড়া চিকন্দী এলাকায় অভিযান চালিয়ে সবুজ দেওয়ানকে আটক করা হয়। এর আগে নিহত নবজাতকের বাবা নূর হোসেন সরদার শুক্রবার রাতে শরীয়তপুরের পালং মডেল থানায় পাঁচজনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন।গ্রেফতারকৃত সবুজ দেওয়ান (২৮) শরীয়তপুর সদর উপজেলার ধানুকা এলাকার বাসিন্দা এবং সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য। তিনি সরকারি গাড়িচালক আবু তাহের দেওয়ানের ছেলে।মামলার বিবরণ, স্বজনদের বক্তব্য ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর এলাকার নূর হোসেন সরদারের স্ত্রী রুমা বেগম বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) দুপুরে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে একটি ছেলে সন্তান প্রসব করেন। শিশুটির শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত ঢাকা নেয়ার পরামর্শ দেন।রাতেই পরিবারের পক্ষ থেকে একটি বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করা হয়। তবে সদর হাসপাতালে পৌঁছানোর পর স্থানীয় প্রভাবশালী অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের সদস্য সবুজ দেওয়ান ও তার বাবা আবু তাহের দেওয়ান ওই অ্যাম্বুলেন্সটিকে জোর করে আটকে দেন। চালকের কাছ থেকে চাবি কেড়ে নিয়ে তাকে লাঞ্ছিত করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে প্রায় ৪০ মিনিট সময় নষ্ট হয়। এর মধ্যে অক্সিজেন স্বল্পতায় নবজাতকটির শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে সে পথেই মারা যায়।নিহত শিশুর বাবা নূর হোসেন বলেন, ‘আমার সন্তানের মৃত্যুতে শুধু আমরা না, পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত। আমি চাই, এই বর্বর ঘটনার প্রত্যেক অপরাধীকে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। যাতে কেউ আর এভাবে অসহায় মানুষের জীবন নিয়ে খেলতে না পারে।’র্যাব-৮ এর কোম্পানি কমান্ডার ও পুলিশ সুপার মীর মনির হোসেন জানান, ‘গোপন সংবাদের ভিত্তিতে মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি আসামিদেরও ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’স্থানীয়রা জানায়, শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে একটি অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল চত্বর নিয়ন্ত্রণ করে তারা ঠিক করে দেয় কোন অ্যাম্বুলেন্স চলবে আর কোনটি পারবে না। রোগীর পরিবারের ইচ্ছা বা প্রয়োজন এখানে কোনো মূল্য পায় না। বাইরে থেকে আনা অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে দেওয়া হয়, চালককে মারধর ও হেনস্থা করা হয়। একেকটি রোগীবাহী ট্রিপে পরিবারের খরচ পড়ে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত, যার বড় একটি অংশ সিন্ডিকেট সদস্যদের পকেটে চলে যায়। অথচ চালক পান সর্বোচ্চ ৩,৫০০ টাকা।এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালক, হাসপাতালের কিছু কর্মচারী ও স্বাস্থ্য বিভাগের একাংশের সম্পৃক্ততার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সদর হাসপাতালের সরকারি চালক জাহাঙ্গীর হোসেন, সিভিল সার্জনের গাড়িচালক আবু তাহের দেওয়ান ও তার ছেলে সবুজ দেওয়ান সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন।১০০ শয্যার শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে বর্তমানে একটি মাত্র সরকারি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে, যা রোগীর তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। ফলে, বেসরকারি ১৮টি অ্যাম্বুলেন্সকে ঘিরে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট পুরো ব্যবস্থাকে জিম্মি করে ফেলেছে। এই অ্যাম্বুলেন্সগুলোর বেশিরভাগেই নেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম—যেমন: স্ট্রেচার, অক্সিজেন সিলিন্ডার, সাকশন মেশিন, পালস অক্সিমিটার বা ব্যাক বোর্ড।হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালের কেউ যদি এর সঙ্গে জড়িত থাকে, তদন্ত করে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স রাখার অনুমতি না থাকলেও তারা নিয়মিত হাসপাতালের প্রাঙ্গণে অবস্থান করে।’এনআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
