প্রতিটি উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভায় মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চোরাকারবারি, চাঁদাবাজ এমনকি অস্ত্রবাজ ও সংশ্লিষ্টদের নামসহ নানা সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়ে থাকে। এটি উপজেলার সার্বিক আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যাপক জরুরি। তবে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার সেই সভাতেই অনাহূতদের অবাধ আসা-যাওয়া! সংবেদনশীল আলোচনার এমন এক সভায় বসে থাকছেন এমন লোক, যাদের কোনো সরকারি দায়িত্ব নেই, নেই কমিটির আনুষ্ঠানিক সদস্যপদও। ফলে, এই সভা পরিণত হচ্ছে ‘তথ্য পাচারের উন্মুক্ত দরজায়’।জানা গেছে, উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা সভায় নির্ধারিত সদস্যদের পাশাপাশি অচেনা মুখও দেখা যাচ্ছে। এদের কেউ পরিচিত রাজনৈতিক কর্মী, কেউ আবার ব্যবসায়ী, আবার কেউ ‘সাংবাদিক’ পরিচয় দিয়ে ঢুকে পড়ছেন। প্রবেশপত্র বা যাচাই-বাছাইয়ের কোনো বাধা না থাকায় আমন্ত্রিত নন এমন ব্যক্তিরাও চুপচাপ চেয়ার টেনে বসে পড়ছেন।উপজেলা প্রশাসনের মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভা, যেখানে মাদক কারবারিদের নাম-ঠিকানা থেকে শুরু করে, সন্ত্রাসীদের গতিবিধি, চোরাকারবারি ও অস্ত্র চক্রের গতিপথ—সব বিশদে আলোচনা হয়, সেখানেই অবাঞ্ছিতদের এই অবাধ প্রবেশ। সভা পরিচালনাকারী কর্মকর্তারাও অনেক সময় অনাহূতদের সেখানেই বসে থাকতে দিচ্ছেন—যেন গোপন আলোচনা নয়, বরং উন্মুক্ত জনসভা চলছে। গত কয়েক মাসের নিয়মিত চিত্র এটি। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এই অবাঞ্ছিত উপস্থিতি শুধু শোভামণ্ডিত নয়, বরং ভয়ংকর ফল বয়ে আনছে। সভায় আলোচনার পরই তা অপরাধীদের কানে পৌঁছে যায়।আইনশৃঙ্খলা কমিটি মূলত প্রশাসন, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় প্ল্যাটফর্ম। এখানে সন্ত্রাস, মাদক, নারী নির্যাতন, চোরাচালান, সামাজিক অপরাধ—সব বিষয়ে তথ্য শেয়ার হয় এবং অভিযানের পরিকল্পনা হয়।আগে এই সভা ছিল কড়া নিয়ন্ত্রণে। সদস্য তালিকা, নিরাপত্তা প্রহরী—সব কিছু নিশ্চিত করা হতো। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্টের পর এই নিয়ন্ত্রণ শিথিল হতে শুরু করে। কেন এমন হচ্ছে? সভায় অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা মাদক কারবারির নেটওয়ার্ক, সন্ত্রাসীদের অবস্থান, অভিযান পরিকল্পনা—সবই খোলামেলা বলি। কিন্তু যখন দেখি অপরিচিত লোক বসে শুনছে, তখন কথা বলতেও দ্বিধা হয়।’তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জানি, এই লোকদের এখানে থাকার কথা নয়। কিন্তু কেউ যদি রাজনৈতিক নেতার ঘনিষ্ঠ হয়, কিংবা প্রভাবশালী মহলের লোক হয়, তখন তাদের বের করতে গেলে উল্টো বিপদ হতে পারে।’একাধিক সূত্র বলছে, সভা শেষ হতেই এসব অনাহূত অংশগ্রহণকারী তথ্য বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন। কোথাও কোথাও অভিযানের আগেই খবর ফাঁস হয়ে যাওয়ায় পুলিশ বা প্রশাসনের তৎপরতা ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি সন্দেহভাজন অপরাধীদের সতর্কবার্তাও পৌঁছে যাচ্ছে তাদের হাতে।অন্য এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা চাই, সভা হোক কেবল অনুমোদিত সদস্যদের নিয়ে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, অনাহূতদের প্রবেশ ঠেকানোর মতো ব্যবস্থা নেই। ফলে, আমরা যা বলি—তা সবার কানে পৌঁছে যায়।’একজন জনপ্রতিনিধি বলেন, ‘সভায় আসা কিছু অচেনা মুখ আসলে কারও না কারও হয়ে কাজ করে। তারা তথ্য নিয়ে বাইরে গিয়ে বিক্রি করে বা সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে।’একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা সভা যদি সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়, তাহলে অপরাধীরা আমাদের পরিকল্পনা আগেভাগেই জেনে যাবে। এটা পুরো সিস্টেমের জন্য মারাত্মক হুমকি।’তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা সভায় ডাকাই হয় না।’তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সভায় ঢোকা এখন একরকম নিয়মে পরিণত হয়েছে। নির্দিষ্ট আমন্ত্রণ না থাকলেও স্থানীয় রাজনৈতিক পরিচয়ে দায়িত্বপ্রাপ্তরা আর বাধা দেন না। ফলে সভার গোপনীয়তা ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে।আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে সাতকানিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিতে পারে। মাদক, অস্ত্র ও চোরাচালান চক্র এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের সুরক্ষিত করছে। একইসঙ্গে প্রশাসনের ভেতরের সংবেদনশীল তথ্য এখন ‘বিক্রিযোগ্য পণ্য’ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।এ বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসানের সরকারি মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সংযোগ না পাওয়ায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।আরডি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
