জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: আমাদের প্রত্যাশা ও সীমাবদ্ধতা’ বিষয়ক আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের কনফারেন্স কক্ষে ৫ আগস্ট ২০২৫, মঙ্গলবার সকালে এই অনুষ্ঠান শুরু হয়।অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শহীদ আসির ইনতিশারুল হক এর শ্রদ্ধেয় পিতা আ. হ. ম. এনামুল হক লিটন এবং শহীদ মো. হৃদয় ইসলামের শ্রদ্ধেয় মাতা মাজেদা খাতুন। বক্তব্যে আ. হ. ম. এনামুল হক লিটন বলেন, ‘আজকের দিনটি একদিকে আনন্দের এবং একই সাথে বেদনার। কারণ ২০২৪ সালের আজকের দিনে আমি আমার সন্তানকে হারিয়েছি, এটা আমার জন্য বেদনার। তবে আমার সন্তানের জীবনের বিনিময়ে দেশ আজ ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে, এটা আনন্দের।’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নীতি-নৈতিকতা শিক্ষা প্রদানের বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে তিনি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র কায়েম করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।মাজেদা খাতুন বলেন, ‘আমি আমার ছেলের বিচার এখনো পাইনি।’ এ সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যত বড় ত্যাগ, ততো বড় অর্জন করা সম্ভব। ৯০, ৭১ ও ২৪ এর কোন আন্দোলনই ত্যাগ ছাড়া সফলতা আসেনি। ৯০ এ যেমন কাফিউ ভঙ্গ করে মিছিলে গিয়েছিলাম, একইভাবে জুলাই ২৪ এও কাফিউ ভঙ্গ করে মিছিলে গিয়েছিলাম।’জুলাইকে একতা, প্রেরণা ও সাহসের প্রতীক উল্লেখ করে উপাচার্য আরও বলেন, ‘আমরা যেন সামনের দিনগুলোতে জুলাই চেতনাকে ধারণ করে কাজ করি। আগামীতে যে সরকারই আসুক, ৫ আগস্টের চেতনা থেকে বিচ্যুত হলে তাদেরও একই অবস্থা তৈরি হবে।’ তিনি প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠ্য বইয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের মতো জুলাই ২০২৪-এর ইতিহাস সংযোজনের আহ্বান জানান।প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান লিটন। তিনি বলেন, ‘আমরা ভুলে যাওয়া জাতি, সবকিছু সহজেই ভুলে যাই। তবে জুলাই ২৪ কখনো ভুলে গেলে চলবে না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই আমাদের কখনো জুলাইকে ভুলতে দিবে না। আমি অনেক ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে সংরক্ষণ করে রেখেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে শেখ হাসিনার মতো এতো বৈচিত্রময় ফ্যাসিস্ট আর আছে বলে আমার জানা নাই। এদেশের কর্তৃত্ব নেওয়ার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশের সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে। অনেক কষ্টের বিনিময়ে আজকের এই অর্জন। সকলকে ঐক্যবদ্ধ থেকে এই অর্জনকে দেশের স্বার্থে কাজে লাগাতে হবে। শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না।’অনুষ্ঠানের শুরুতে জুলাই শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পেশ ইমাম হাফেজ মুফতি মো. আব্দুল হাকীম। সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর শুরু হয় আলোচনা সভা। ‘বৈষম্যের বিরুদ্ধে জুলাই চব্বিশ’ শীর্ষক জুলাই স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন করা হয়।জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও রচনা প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. জয়নুল আবেদীন সিদ্দিকী, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪ বর্ষপূর্তি উদ্যাপন কমিটির আহ্বায়ক ও কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা, বিজ্ঞান ও প্রকৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. এ এইচ এম কামাল, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সাখাওয়াত হোসেন সরকার, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বখতিয়ার উদ্দিন ও রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান।স্বাগত বক্তব্য রাখেন লোকপ্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. অলি উল্লাহ এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক মো. জিল্লাল হোসাইন। এ সময় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তারানা নুপুর ও আহত ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী নীরব কুমার দাস বক্তব্য দেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।এর আগে সকালে নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনে থেকে ঢাক-ঢোলের তালে বিজয় র্যালি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। বিকেলে শহীদদের আত্মার মাগফেরাত ও আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে কেন্দ্রীয় মসজিদে মিলাদ মাহফিল এবং সন্ধ্যায় মন্দিরে প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
