আজ  ৫ আগস্ট। আজ থেকে  ঠিক এক বছর আগেই আন্দোলনের মাধ্যমে পতন হয় ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার। গত বছর ১ জুলাই শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয় ৩ আগস্ট থেকে। আর ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের ডাকা ‘সর্বাত্মক অসহযোগে’ নজিরবিহীন সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ফলে ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা তাঁদের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করে। ৩৬ দিনের টানা আন্দোলনে সহস্রাধিক মানুষের জীবনের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশ টু পয়েন্ট ও’। আর এতেই যেন ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায় বিগত সরকার ও সরকারপ্রধানের।তবে ৫ আগস্ট শুধু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন না সেই সাথে সংসদ সদস্য, স্পিকার, প্রধান বিচারপতি এমনকি জাতীয় মসজিদের খতিবও পালিয়ে যায় আন্দোলনের ব্যাপকতায়। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক দলের এমন পরাজয় বিরল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ কর্মসূচি পরিণত হয় ছাত্র-জনতার দুর্বার আন্দোলনে। সরকারবিহীন এক জাতির দায়িত্ব নেন সেনাপ্রধান। জানান, বিচার হবে সকল হত্যাকাণ্ডের।কেমন ছিলো সেদিনের ৫ আগস্ট! সকাল থেকে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিলো রাজধানী ঢাকায়।  দুপুর ১১ টার পর বাড়তে থাকে মানুষের ঢল। দুপুর গড়াতে এই ঢ্ল পরিণত হয় জনসমুদ্রে।  সরকার পতনের এক দফা দাবিতে ডাকা ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ বা ঢাকামুখী গণযাত্রা সফল করতে কারফিউ অমান্য করে রাজধানীর রাস্তায় নেমে আসে লাখো মানুষ। ঢাকার বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে মানুষ আসতে থাকে। যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, শহীদ মিনার, বাড্ডা, মিরপুরসহ বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভকারীদের জমায়েতের খবর আসতে শুরু করে। রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী অবস্থান নিলেও রোধ করা যায়নি ঢাকামুখী জনস্রোত। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষও হয়।এমন পরিস্থিতিতে গণভবন ছেড়ে তড়িঘড়ি করে পদত্যাগের পর দুপুর আড়াইটার দিকে একটি সামরিক বিমানে করে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানা। তাঁদের বহনকারী হেলিকপ্টার, বিমান বাহিনীর এমআই‑১৭  প্রথমে গণভবন থেকে তখনকার বিমানবাহিনী ঘাঁটি বঙ্গবন্ধুতে যায় পরে সেখান থেকে সি১৩০ জুলিয়েট হারকিউলিসে করে শেখ হাসিনা তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে পালিয়ে যান ভারতের গাজিয়াবাদের হিন্দোন বিমান ঘাটিতে।তবে দুপুর নাগাদ অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়, নড়ে যাচ্ছে সরকার। কারণ  দুপুর সোয়া ১টার দিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন। তখনই মানুষ বুঝে যায়, কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।  এরই মধ্যে গণমাধ্যমে খবর আসে। দেশ ছেড়ে পালিয়েছে শেখ হাসিনা। পতন হয়েছে ১৬ বছরের স্বৈরাচারী সরকার ব্যবস্থার। কিন্তু পরিস্কার কোনো ঘোষণা নেই। ২টায় সেনাপ্রধানের ভাষণ। সবার চোখ ছিল মোবাইল বা টিভিতে। পরে  ১ ঘণ্টা বিলম্বে বেলা ৩ টায় জাতির উদ্দেশ্যে দেষা ভাষনে সেনাপ্রধান নিশ্চিত করেন দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন শেখ হাসিনা।তখনই বিজয় উল্লাসে নামে পুরো জাতি। ছাত্র-জনতার জনসমুদ্র ততক্ষণে গণভবনে পৌঁছে যায় বিজয় মিছিল নিয়ে। গণভবনের প্রতিটি কোনায় তখন বাংলার মানুষের উপস্থিতি। পাশের লেকে নেমে গোসল করে হাজার হাজার মানুষ। সকলের মধ্যে তখন বিরাজ করছিল অদম্য-বুনো উল্লাস। আবেগ–আপ্লুত হয়ে কেউ কেউ কান্নাও করে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশে কেউ আবার আদায় করেন নামাজ। শুধু গণভবন নয়, সংসদ ভবনেও বুনো উল্লাসে মেতে ওঠে ছাত্র-জনতা। গণতন্ত্রকে ফিরে পাবার আনন্দেই যেন এমন উল্লাস-আনন্দ-আর হাসিমুখ।প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েরও নিয়ন্ত্রণ নেয় সাধারণ মানুষ। বৈঠক রুম, দরবার হলসহ প্রতিটি কক্ষে মানুষ প্রবেশ করে। অনেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ছাদে উঠে। সেখানে দাঁড়িয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা হয়। বিজয়োল্লাসের পাশাপাশি এসব জায়গায় ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। এদিকে সকলে যখন বিজয় উল্লাসে ব্যস্ত ঠিক তখনই রাজধানীর যাত্রাবাড়িতে তখনও পুলিশ নির্বিচারে মানুষ মারছে। বিজয় উল্লাসে অংশ নিতে এসে লাশের স্তুপে পরিণত হয় অনেকেই। যাত্রাবাড়ি পুলিশ স্টেশনের সামনে সেই সহিংসতায় শুধু ঐদিনই মারা যায় ৫৫ জনের বেশি। ওদিকে শহরের আরেক প্রান্ত আশুলিয়ায় তখন নারকীয়ভাবে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে আরও ৬ জনকে। এদিন বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারী কয়েকটি থানায় হামলা ভাংচুর, আগুন দেয় ।অন্যদিকে সরকার পতনের পর যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন হোটেল দ্য জাবির যশোরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এতে দগ্ধ হয়ে অন্তত ২৫ জন নিহত হয় যাদের ভিতর বেশিরভাগই ছিল ফরেনার এছাড়াও ২০ জন গুরুতর আহত হয়। সে সময়ের গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এদিনের সংঘর্ষ, সহিংসতা ও গুলিতে অন্তত ১০৯ জন নিহত হয়। আহত হয় অনেকে।    এমন পরিস্থিতিতে বিকালে সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনানীবাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনা করেন। এদিন, সন্ধ্যার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন নিয়ে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সাথে বৈঠক করেন সেনাপ্রধান ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। ছিলেন বিএনপি-জামায়াত সহ রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর বিকেলে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি বলেন, ‘দেশে একটা ক্রান্তিকাল চলছে। সব রাজনৈতিক দলের নেতাদের আমন্ত্রণ করেছিলাম। আলোচনায় আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, সব হত্যা, সব অন্যায়ের বিচার আমরা করব। আপনারা সেনাবাহিনীর প্রতি, সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি আস্থা রাখুন।’জুলাইয়ের এক তারিখে শুরু হওয়া টানা ৩৬ দিনের কোটা সংস্কার আন্দোলন শেষ হয় স্বৈরাচারি শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে। এই প্রজন্ম ৭১ না দেখলেও তারা সৃষ্টি করেছে নতুন এক বাংলাদেশের। যেখানে গণতন্ত্র, অধিকার ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের পথটা হবে ঋদ্ধ।এবি 

Source: সময়ের কন্ঠস্বর

সম্পর্কিত সংবাদ
শেষটা ভালো হলো না আন্দ্রে রাসেলের
শেষটা ভালো হলো না আন্দ্রে রাসেলের

দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষটা রাঙাতে চেয়েছিলেন আন্দ্রে রাসেল। বিদায়বেলায় মাঠে গার্ড অব অনার পেয়েছেন, ব্যাট হাতে খেলেছেন ১৫ বলে ৩৬ Read more

পঞ্চগড়ে ৩ হাজার চা গাছ উপড়ে ফেললো দুর্বৃত্তরা, সর্বস্বান্ত পরিবার
পঞ্চগড়ে ৩ হাজার চা গাছ উপড়ে ফেললো দুর্বৃত্তরা, সর্বস্বান্ত পরিবার

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে জমি দখলে নিতে রাতের আঁধারে প্রায় ৩ হাজার চা গাছ উপড়ে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। ২০১৮ সালে গড়ে তোলা চা Read more

মেক্সিকোতে মাদক কারবারি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ, নিহত ১৩
মেক্সিকোতে মাদক কারবারি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ, নিহত ১৩

মেক্সিকোর সিনালোয়ায় রাজ্যে সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে মাদক কারবারিদের সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ১৩ হামলাকারী নিহত হয়েছে।সোমবার (০৩ নভেম্বর) দুপুরে এ ঘটনাটি Read more

বরিশালে প্রবাসী স্বামীকে ভিডিও কলে রেখে স্ত্রীর আত্মহত্যা
বরিশালে প্রবাসী স্বামীকে ভিডিও কলে রেখে স্ত্রীর আত্মহত্যা

দুবাই প্রবাসী স্বামীকে ভিডিও কলে রেখে আত্মহত্যা করেছেন স্ত্রী আফরিন আক্তার দিপুমনি। ঘটনাটি ঘটেছে বরিশালের মুলাদী উপজেলার গাছুয়া ইউনিয়নের মধ্য Read more

আমরা নিরপেক্ষ নই ,    জনতার পক্ষে - অন্যায়ের বিপক্ষে ।    গণমাধ্যমের এ সংগ্রামে -    প্রকাশ্যে বলি ও লিখি ।   

NewsClub.in আমাদের ভারতীয় সহযোগী মাধ্যমটি দেখুন