কক্সবাজারের উখিয়ায় টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুরু হওয়া একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সংস্কার কাজ দীর্ঘদিনেও শেষ হয়নি। যথাযথ তদারকির অভাব ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের গাফিলতির কারণে এসব জনবহুল এলাকার সড়কগুলো এখন বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে, এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। ধানের চারা রোপণ করেও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে, তারপরও মিলছে না কোনো প্রতিকার। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ ৩টি ইউনিয়নের এই সড়কগুলোতে খানাখন্দ, সড়কে খোয়ার স্তুপ, কাঁচা মাটি ও অসমাপ্ত কাজের কারণে জনসাধারণের চলাচলে সীমাহীন দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তার মাঝে বড় বড় গর্তে বৃষ্টির পানি জমে কাদা সৃষ্টি হওয়ায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই পথচারী ও যানবাহনগুলো চলাচল করছে। বিশেষ করে উখিয়ার হাজিরপাড়া-দৌছড়ি সড়ক, গয়ালমারা-আমতলী সড়ক, উত্তরপুকুরিয়া-রুহুল্লার ডেবা সড়ক এবং থাইংখালী-ধামনখালী সড়কসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পথ ২ বছর আগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংস্কারের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু আজ অবধি কোনো সড়কেরই সংস্কার কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। কোথাও কেবল মাটি কেটে ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও খোয়া ছড়িয়ে অসমাপ্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে, আবার কোথাও পাহাড়ি মাটি ফেলে কাদাযুক্ত করে রাখা হয়েছে। এর ফলে পুরো যোগাযোগ ব্যবস্থায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, আর সাধারণ মানুষ পড়েছে চরম দুর্ভোগে। রাজাপালং ইউনিয়নের হাজিরপাড়া-দৌছড়ি সড়করাজাপালং ইউনিয়নের জনবহুল এই সড়কটি অন্তত ৫-৬টি গ্রামের প্রায় ২০ হাজারের বেশি মানুষের চলাচলের প্রধান ভরসা। এর মধ্যে রয়েছে চেংখোলা, মালিয়ারখোল, দৌছড়ী, হাজিরপাড়া এবং খয়রাতি পাড়ার একটি অংশ। পাশাপাশি, এটি আশপাশের আরও বেশ কিছু সংযোগ সড়কের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা সড়কটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে। সড়কটি দিয়ে চলাচলকারী গণমাধ্যম কর্মী মোহাম্মদ নাসিম উদ্দিন বলেন, ‘এই সড়কে প্রতিদিন হাজারো মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। কোনোভাবে মানুষ চলাচল করতে পারলেও গাড়ি চলাচল সম্পূর্ণ এখন বন্ধ।’ উত্তরপুকুরিয়া-রুহুল্লার ডেবা সড়কউত্তরপুকুরিয়া-রুহুল্লার ডেবা সড়কটি রাজাপালং ইউনিয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ যোগাযোগ পথ। প্রতিদিন এ সড়ক দিয়ে শত শত মানুষ চলাচল করে থাকেন। কিন্তু সড়কটি সংস্কারের জন্য খনন করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন এলাকাবাসী। রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মীর শাহেদুল ইসলাম রোমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, ‘আমার ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি সড়ক নিয়ে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন সাধারণ মানুষ। বিষয়গুলো আমি উপজেলা সমন্বয় সভাতেও তুলে ধরেছি। কিন্তু এখনো কোনো কার্যকর প্রতিকার দেখছি না। ঠিকাদারের গাফিলতির মূল কারণ এলজিইডি কর্মকর্তাদের অবহেলা। তারা কাজের অগ্রগতি না দেখেই “রানিং বিল” নামে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করছেন। এতে ঠিকাদাররা নিজেদের ইচ্ছেমতো কাজ করছে, কিন্তু আমার জনগণের কষ্ট কেউ দেখছে না।’ পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী-ধামনখালী সড়কউখিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী-ধামনখালী সড়কে চলছে দীর্ঘদিনের সংস্কার কার্যক্রম, কিন্তু এখনো কাজ শেষ হয়নি। প্রায় দুই বছর আগে সড়কটির সংস্কার শুরু হলেও কার্পেটিং কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। খোয়া-বালি দিয়ে সড়ক প্রস্তুত থাকলেও পিচ ঢালাইয়ের ধীরগতির কারণে পথচারীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। ইটের খোয়া যুক্ত এই অসম্পূর্ণ সড়কে হাঁটাচলার সময় মানুষকে কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। এই সড়কে নিয়মিত চলাচলকারী স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী আলাউদ্দিন বলেন, ‘সড়কটির সংস্কার দীর্ঘদিন ধরে চললেও এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। গাড়ি কোনোভাবে চলাচল করলেও পথচারীদের কষ্ট সীমাহীন।’ এ বিষয়ে পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম. গফুর উদ্দিন চৌধুরী সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, ‘সংস্কারের নামে সড়ক খুঁড়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাধারণ মানুষের সঙ্গে যেন উপহাস করছে। ঠিকাদাররা জানে যে, এভাবে কাজ ফেলে রাখলে মানুষের ভোগান্তি বাড়ে। তবুও তারা নিজেদের লাভের কথা চিন্তা করে ধীরগতিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই।’ রত্নাপালং ইউনিয়নের গয়ালমারা-আমতলী সড়করত্নাপালং ইউনিয়নের ভালুকিয়া আমতলী ও গয়ালমারা এলাকার প্রায় ৫ হাজারের বেশি মানুষ প্রতিদিন যাতায়াত করেন এই গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দিয়ে। কিন্তু গত দেড় বছর ধরে সড়কটি মাটি ও খোয়া পেলে চলাচলের অনুপযোগী করে রাখা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জন্য চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী জামাল নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘ঠিকাদার শুধু খোয়া পেলে রেখেছে, এরপর কোনো চাপ বা প্রক্রিয়া প্রয়োগ করেনি। ডাম্পট্রাক যেভাবে খোয়া ফেলেছে, প্রায় এক বছর ধরে ঠিক সেভাবেই পড়ে আছে। সড়কের চারপাশেও ভাঙন শুরু হয়েছে। এতে একদিকে যেমন সরকারের অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ পড়ছে দুর্ভোগে।’ এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য অলি আহমেদ সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, ‘দুই বছর আগে এই সড়কের সংস্কার কাজ শুরু হলেও এখনো শেষ হয়নি। এই কাজ এক মাসেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। একবার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পুনরায় সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা জনস্বার্থের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবিচার। লক্ষণীয় বিষয় হলো—মেয়াদ বাড়ানোর পরও ঠিকাদার কাজের অগ্রগতি না দেখিয়ে আগের মতোই খোয়া ফেলে রেখেছে। ফলে জনদুর্ভোগ দিন দিন বেড়েই চলেছে।’ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উখিয়া উপজেলার এই গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়ক সংস্কারের জন্য প্রায় ২৭ কোটি টাকার বাজেট প্রকল্প ছিল। এই প্রকল্পের কাজ শুরু করেন ঠিকাদার আসাদ। গয়ালমারা-আমতলী তে পেয়েছিলেন ঠিকাদার একরাম। প্রথম দফায় টেন্ডারের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় মেয়াদ বাড়িয়ে কাজ চালিয়ে যান তারা। জানা গেছে, ঠিকাদার আসাদ আওয়ামী যুবলীগের একজন পদধারী নেতা হওয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এসব সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের দায়িত্ব পান। কিন্তু ৫ আগস্টের পরবর্তী পট পরিবর্তনের পর থেকে তার কার্যক্রমে মারাত্মক ঢিলেঢালা ভাবে চলে। বর্তমানে তার অধীনে থাকা অধিকাংশ কাজই অর্ধসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে। সড়ক সংস্কারের নামে খুঁড়ে ফেলা হয়েছে অনেক জায়গা, কিন্তু তা আর সম্পন্ন করা হয়নি। অন্যদিকে, গয়ালমারা-আমতলী সড়কে নিয়োজিত আরেক ঠিকাদার একরামের কাজেও রয়েছে চরম স্থবিরতা। অভিযোগ রয়েছে, তিনি একদিন কাজ করলেও পরবর্তী দুই সপ্তাহ কাজে অনুপস্থিত থাকেন। প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সড়ক সংস্কার কার্যক্রমের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। অনেকেই বলছেন, আসাদ এবং একরাম তারা দুইজনই একই সিন্ডিকেটে কাজ করেন। ফলে তাদের কাজ সবখানে এরকম হয়। কাজ পেলে রাখার বিষয়ে জানতে ঠিকাদার আসাদ এবং একরামের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাদের সাড়া মিলেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই জনপদগুলোতে চলাচলের দুরবস্থায় কৃষক, শিক্ষার্থী, অসুস্থ রোগী ও কর্মজীবী মানুষের জন্য তৈরি করেছে এক ধরনের দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি। শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া, রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছানো কিংবা কৃষকদের ফসল পরিবহন, সবক্ষেত্রেই ভোগান্তি চরমে। বছরের পর বছর ধরে এমন ভোগান্তির শিকার হলেও কর্তৃপক্ষ যেন নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। এলজিইডি ও সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের নজরে আনা হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না বলে জানান তারা। সমগ্র বিষয় নিয়ে উখিয়া উপজেলার প্রকৌশলী মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সময়ের কন্ঠস্বরকে বলেন, ‘ঠিকাদার আসাদ এবং একরামের ৪টি সড়কের কাজগুলো ছাড়া উখিয়ায় সব কাজ সম্পন্ন। তারা কাজে গড়িমসি করছে। একজনে মেয়াদ বাড়িয়ে নিয়েছে। আরেকজনকে নোটিশ দিয়েছি। তবে তারা বৃষ্টির অজুহাতে পার পেয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি কমে গেলে কাজ শেষ না করলে তাদের কাজ বাজেয়াপ্ত করা হবে।’এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
