চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের পদুয়া রেঞ্জের বড় দুয়ারা বিট কাম চেক স্টেশনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সরকারিভাবে সৃজিত আগরবাগান এখন অস্তিত্বহীন। বহু কোটি টাকার সরকারি অর্থে যে প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছিল—তা এখন এক শ্রেণির বন কর্মকর্তার দুর্নীতি এবং প্রভাবশালীদের ‘অ্যাগ্রো খামার’ গড়ার খেয়ালে নিশ্চিহ্ন। স্থানীয়রা বলছেন—যারা গাছ লাগানোর দায়িত্বে, তারাই গাছ কাটায় সহযোগিতা করেছে।জানা যায়, ১৯৯৮ ও ২০০৬ সালে সরকার আগরবাগান সম্প্রসারণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুটি প্রকল্প নেয়। সিলেট ও চট্টগ্রামের উপযোগী বনাঞ্চলগুলোতে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বড়দুয়ারা বিটের অন্তর্গত হলুদিয়া মইন্নারটেক, ন্যাচারাল পার্কের গেটের উত্তর পাশে, বড়ুয়াপাড়া, খৈয়াখালী ও বাঁশবুনিয়া এলাকায় ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত রোপণ করা হয় শত শত আগরগাছ। এই বনাঞ্চলগুলোকে বলা হতো ‘আগরের স্বর্ণভূমি’। প্রতিটি গাছের সম্ভাব্য বাজারমূল্য ছিল লক্ষাধিক টাকা।তবে হলুদিয়া বড়ুয়াপাড়ার আগরবাগানে গেলে এখন যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা ভয়াবহ। আগরগাছের ছায়া নেই, চারপাশে মাটি কাটা, পোলট্রি শেড, মাছের পুকুর আর ফলদ বাগান। স্থানীয় মো. সেলিম নামে এক ব্যক্তি সরকারি বনভূমিতে ‘সৌদি বাংলা অ্যাগ্রো ফার্ম’ ও ‘কৃষি খামার’ গড়ে তুলেছেন। সেখানে নিয়মিত পানি সেচ হচ্ছে, শ্রমিকেরা কাজ করছে। অথচ বন বিভাগ সব জানে—কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেই।আগরগাছ উজাড় করে মাছের প্রজেক্ট, পোলট্রি খামার ও ফলদ বাগান গড়ে তোলা সেলিম বলেন, ‘আমি জায়গাটা আমিন নামে একজনের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছি। কিছু জায়গা আমার নিজেরও।’কিন্তু তাকে প্রশ্ন করা হলে—সরকারি বনভূমি কীভাবে ব্যক্তিমালিকানা হলো? কীভাবে ভাড়া দেওয়া সম্ভব?—তিনি কোনো জবাব দিতে পারেননি। পাহাড় কাটার বিষয়ে বলেন, ‘আমি জানি না কে পাহাড় কেটেছে। আমি শুধু কৃষি করছি।’হলুদিয়া মইন্নারটেক অংশে মূলত যেসব এলাকায় আগরবাগান সৃজিত হয়েছিল, তার বড় অংশেই এখন বসতঘর দেখা যাচ্ছে। সেখানকার স্থানীয়রা টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বাসিন্দাদের বন বিভাগের জায়গায় বসতঘর নির্মাণের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে রাতের আঁধারে এসব বসতঘর নির্মাণ করা হয়েছে। অসাধু বন কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রায় এক দশকের ব্যবধানে আগরবাগানটি এখন পাড়ায় পরিণত হয়েছে।খৈয়াখালী অংশে গিয়ে দেখা গেছে, আগরগাছ বলতে কিছু নেই। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মো. আলমগীর সেখানে বড় অংশ দখল করে রেখেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা অনেক পরিবার আগরবাগান উজাড় করে ও পাহাড় কেটে বসতঘর নির্মাণ করেছেন।স্থানীয় মো. বশির আহমদ বলেন, ‘বন বিভাগের কর্মকর্তারা সামান্য কিছু টাকার লোভে কোটি টাকার আগরবাগান ধ্বংস করে দিয়েছেন। তাদের নাকের ডগায় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি আগরবাগান উজাড় করে বসতঘর নির্মাণ, মাছের প্রজেক্ট, পোলট্রি খামার ও ফলদ বাগান করেছেন। তারা সেখানে যাতায়াতের জন্য পাহাড় কেটে রাস্তাও করেছেন।’তিনি আরও বলেন, ‘বন বিভাগের কর্মকর্তারা রাতের বেলায় দখলদারদের সাথে বসে চা খায়। সকালে এসে বলে “উপর থেকে কিছু করতে বলা হয়নি।” কোটি টাকার আগরবাগান উজাড় হয়ে গেল, অথচ কারও শাস্তি নেই!’জানতে চাইলে বড়দুয়ারা বিট কর্মকর্তা মো. বজলুর রশিদ বলেন, ‘বসতঘর উচ্ছেদের জন্য তালিকা পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া সম্প্রতি আগরবাগানের মধ্যে ফাঁকা জায়গাগুলোতে বিভিন্ন বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণ করা হয়েছে।’সেলিম ও অন্য দখলদারদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। আদালতের আদেশ পেলে উচ্ছেদ করব।’এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
