মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার বয়রাগাদী ইউনিয়নের কুমারখালী গ্রামের একমাত্র সড়কটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। প্রায় ৯০০ মিটার সড়কজুড়ে বড় বড় গর্ত, কাদা-পানি আর কর্দমাক্ত পথ যেন জনদুর্ভোগের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে সড়কটি একেবারেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে কুমারখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শতাধিক শিক্ষার্থী।শনিবার (২ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কুমারখালী গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহজালালের বাড়ি থেকে মুনতুজ আলীর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার বিভিন্ন অংশে হাঁটুসমান কাদা-পানি জমে আছে। কোথাও কোথাও ইট-বালুর কোনো চিহ্নই নেই। পথচারীরা কেউ খালি পায়ে, কেউবা জুতা হাতে নিয়ে কষ্ট করে পথ পার হচ্ছেন। একজন বৃদ্ধকে কয়েকবার পিছলে যেতে দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের স্কুল পোশাক কাদায় ভিজে নোংরা হয়ে গেছে।স্থানীয়রা জানান, পুরো রাস্তাটির দৈর্ঘ্য প্রায় দুই কিলোমিটার। ডিসি প্রজেক্ট থেকে সাহাজুল্লার বাড়ি পর্যন্ত কিছু অংশে ইটের সলিং থাকলেও বাকিটুকু বহুদিন ধরেই অনুন্নত অবস্থায় পড়ে আছে। সবচেয়ে দুরবস্থায় আছে মো. শাহজালালের বাড়ি থেকে মুনতুজ আলীর বাড়ি পর্যন্ত প্রায় ৯০০ মিটার অংশ।কুমারখালী গ্রামের বাসিন্দা মো. সামেদ আলী বলেন, ‘এই রাস্তাটি বছরের পর বছর খারাপ। বর্ষায় অবস্থা আরও ভয়াবহ হয়ে যায়। স্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারা কাদা পার হয়ে যেতে হয়, তাদের খুব কষ্ট হয়। আমরা অনেকবার বলেছি, কেউ গুরুত্ব দেয় না।’বাসিন্দা নুর ইসলাম বলেন, ‘একেক জায়গায় এমন গর্ত হয়েছে যে, রিকশা উল্টে যেতে পারে। ভ্যান-মোটরসাইকেল চলে না। বর্ষাকালে চলাচল একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।’গৃহবধূ খতেজা বিবি বলেন, ‘আমি মাঝেমধ্যে বাজারে যাই। কাদা-মাটিতে পা পিছলে যায়, অনেকবার পড়ে যাওয়ার ভয় পাই। একবার অসুস্থ স্বামীকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে রাস্তায় পড়ে বড় সমস্যায় পড়েছিলাম।’কুমারখালী গ্রামের আরেকজন বাসিন্দা শাহাবুদ্দিন মিয়া বলেন, ‘কুমারখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১০০-এর বেশি শিক্ষার্থী আছে। তারা প্রতিদিন এই রাস্তায় পড়ে গিয়ে আহত হয়। পানি জমে থাকে, মশার উপদ্রব বেড়েছে।’কুমারখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দেলোয়ারা বেগম জানান, ‘বর্ষায় অনেক শিক্ষার্থী কাদা মাড়িয়ে স্কুলে আসতে পারে না। এতে তাদের পড়াশোনায় বিরূপ প্রভাব পড়ে। রাস্তাটি শিক্ষার্থীদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’আরেকজন বাসিন্দা মো. মাছুম খান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রতিনিধিদের জানানোর পরও রাস্তাটির স্থায়ী সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাই স্থানীয়রা ইট-বালু ফেলে কোনোমতে চলাচলের চেষ্টা করছে। তবে ইট-বালু বর্ষার পানিতে ধুয়ে যায়। আমরা এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই।’অটোরিকশাচালক ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমি প্রতিদিন বালুচর বাজার থেকে কুমারখালী রুটে যাত্রী আনা-নেওয়া করি। কিন্তু শাহজালালের বাড়ি থেকে মুনতুজ আলীর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার অবস্থা এতটাই খারাপ যে সেখানে গাড়ি নিয়ে চলাফেরা করা ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময় কাদা-মাটিতে চাকা আটকে যায়, তখন যাত্রী নামিয়ে দিতে হয়, আর আশপাশের মানুষকে ডেকে ধাক্কা দিয়ে রিকশা তুলতে হয়। বর্ষাকালে অবস্থা আরও ভয়াবহ। রোগী বা বয়স্ক যাত্রী থাকলে আমাদের বিপাকে পড়তে হয়, কারণ গাড়ি ওই কাদায় ঠেলে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।’তিনি আরো বলেন, ‘এমন পরিস্থিতিতে রোজগার করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকে দূর থেকে গাড়ি নিয়ে আসতে চান না, যাত্রীরাও ভয় পান এই রাস্তায় উঠতে। আমরা বারবার বলছি, আমাদের এই রাস্তা দ্রুত পাকা করে দেওয়া হোক। এটা শুধু চালকদের সমস্যা না, এটা পুরো এলাকার মানুষের সমস্যা।’বয়রাগাদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম হাবিবুর রহমান সোহাগ বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে এই রাস্তাটিই সবচেয়ে বেশি জরুরি সংস্কারের জন্য। বিষয়টি আমি বারবার উপজেলা সমন্বয় সভায় তুলেছি। নিজ উদ্যোগেও কিছু জায়গায় সাময়িক সংস্কার করেছি। কিন্তু যেহেতু এটি এলজিইডির আওতায়, তাই প্রকল্প অনুমোদন ও বরাদ্দ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সরকার পরিবর্তনের কারণে কিছু বিলম্ব হয়েছে। নতুন উপজেলা প্রকৌশলী যোগদানের পর আমি তাঁকে নিয়ে একাধিকবার বিষয়টি আলোচনা করেছি। ইতোমধ্যে তিনি টিম পাঠিয়ে সরেজমিনে অবস্থা পরিদর্শন করেছেন। আশাবাদী, খুব শিগগিরই সংস্কার কাজ শুরু হবে।’উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী মো. আসিফ উল্লাহ বলেন, ‘চেয়ারম্যান আমাকে রাস্তাটির অবস্থা জানালে আমরা তা গুরুত্ব দিয়ে দেখি। সহকারী প্রকৌশলীকে পাঠিয়ে পরিদর্শন করানো হয়েছে। রাস্তাটি আমরা পরবর্তী বরাদ্দের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছি। নতুন প্রকল্প অনুমোদন পেলেই এটি সংস্কারের কার্যক্রম শুরু করা হবে। আমাদের লক্ষ্য, এই এলাকার মানুষ যেন নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারেন।’এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
