পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের রাবনাবাদ নদী তীরবর্তী আটখালী এলাকায় টেকসই বেড়িবাঁধের অভাবে ভয়াবহ নদীভাঙনের মুখে পড়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা, আবাদি জমি, ঘরবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) গত কয়েক বছর ধরে জিও ব্যাগ (বালুভর্তি বস্তা) ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করলেও তা কোনো কাজেই আসছে না। এতে একদিকে সরকারি অর্থের অপচয় বাড়ছে, অন্যদিকে দিন দিন বাড়ছে নদীভাঙনের তীব্রতা।সরাসরি হুমকির মুখে পড়েছে গলাচিপা-বাউফল আঞ্চলিক মহাসড়ক, ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, শতবর্ষী জমিদারবাড়ি, স্কুল, মসজিদ, মন্দির এবং বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আলতাফ মাহমুদের কবরস্থান। এর আগে ২০২৪ সালে ঘূর্ণিঝড় রেমাল ও পূর্ণিমার জোয়ারের ধাক্কায় তেঁতুলতলা এলাকার ১০০ মিটার বাঁধ ও ১০ মিটার সড়ক ধসে পড়ে। এর ফলে অন্তত পাঁচটি ইউনিয়নের সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বিঘ্নিত হয়েছে, যা আরো তিনটি উপজেলার সঙ্গেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। সড়কটি দিয়ে যানচলাচল বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন। পরে জিও ব্যাগ ফেলে সড়কটি রক্ষা করার চেষ্টা করা হলেও কোনো কাজে আসেনি। প্রতিবার ঘূর্ণিঝড় ও নিম্নচাপের প্রভাবে বেড়িবাঁধ দিয়ে পানি ঢুকে প্লাবিত হয় গ্রাম। বেড়িবাঁধ ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় থাকে স্থানীয়রা। এর মধ্যে সড়কের দুই-তৃতীয়াংশ নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। সড়কটি দিয়ে ভারি যানবাহন চলাচল বন্ধ, এমনকি ছোট যানবাহন চলাচল বন্ধ হওয়ার পথে। এই এলাকায় নদী ভাঙন রোধে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে এলাকাবাসী দাবি জানিয়ে আসছে, মানববন্ধন করেছে এবং স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে। তবে আজও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। প্রতিবছর বর্ষা এলেই জিও ব্যাগ ফেলে দায়সারা কর্তৃপক্ষ।‘জিও ব্যাগে কাজ হয় না’ স্থানীয়দের ক্ষোভপাউবোর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মিরাজ গাজী বলেন, ‘জোয়ারের সময় তেঁতুলতলা এলাকায় বাঁধে প্রচণ্ড স্রোতের আঘাত লাগে। রেমাল ঘূর্ণিঝড়ের পর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তারপর জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে, তবে পরিস্থিতি জটিল।’এদিকে স্থানীয়দের দাবি, শুধু জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়। ডাকুয়া এলাকার বাসিন্দা আনসার খান বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে শুনছি বাঁধ হবে, টাকাও বরাদ্দ হয় শুনি। বাস্তবে দেখা যায়, বর্ষা এলেই কয়েকটা জিও ব্যাগ ফেলে চলে যায়। এতে কাজ হয় না—ভাঙন বাড়ে।’স্থানীয় বাসিন্দা আলাউদ্দিন গাজী বলেন, ‘জোয়ারে সড়ক ডুবে যায়। গাছ পড়ে যায়, মাটি সরে যায়। রাস্তা দিয়ে চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এখনই ব্যবস্থা না নিলে কিছুদিনের মধ্যেই পুরো সড়ক নদীতে চলে যাবে।’আটখালী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী প্রধান শিক্ষক দীপক নারয়ণ ভূঁইয়া জানান, ‘জোয়ারের সময় রাবনাবাদ নদীর প্রবল স্রোত সরাসরি বাঁধে আঘাত করছে। বিশেষ করে অমাবস্যা-পূর্ণিমার প্রভাবে জোয়ারের প্রবল চাপে বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে, যা এখন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না।’ডাকুয়া ইউপি চেয়ারম্যান বিশ্বজিত রায় বলেন, ‘নদী ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে সাংবাদিক নেতা আলতাফ মাহমুদের কবর, ইউনিয়ন পরিষদ, দুটি স্কুল, মসজিদ, মন্দির, বাজার, শত বছরের জমিদারবাড়ি। যান চলাচল বন্ধ হলে প্রায় দেড় লাখ মানুষের জীবন ব্যাহত হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখন আর জিও ব্যাগ দিয়ে চলবে না। নদীশাসন ও খনন করে নদীর গতিপথ বদলাতে হবে। তবেই টেকসই সমাধান আসবে।’গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘বাঁধ ও সড়ক ধসের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়েছে।’পটুয়াখালী পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. মিরাজ গাজী জানান, ‘ভাঙন রোধে প্রাথমিকভাবে ৫০ হাজার জিও ব্যাগ ফেলে নদী সংরক্ষণকাজ শুরু হয়। এতে ১ কোটি ৭২ লাখ টাকা খরচ ধরা হয়। ইতোমধ্যে ৩৩ হাজার ব্যাগ ফেলা হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, ‘ক্লাইমেট স্মার্ট’ প্রকল্পের আওতায় জমি অধিগ্রহণ করে বাঁধের অভ্যন্তরে একটি নতুন বেড়িবাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। যেসব এলাকায় ভাঙন তীব্র, সেসব স্থানে প্রায় ১ কিলোমিটার পর্যন্ত রক্ষা ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়ে প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) দপ্তরে অনুমোদনের জন্য নোটিশ পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই কাজ শুরু হবে।পাউবো সূত্র জানায়, ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে গলাচিপার ৫৫/১ নম্বর পোল্ডারের আওতায় রাবনাবাদ, কলাগাছিয়া ও লোহালিয়া নদী তীরবর্তী ৪৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। পরে এলজিইডি ১৯৯৫-৯৬ সালে এই বাঁধের ওপর ২১ কিলোমিটার কার্পেটিং সড়ক নির্মাণ করে, যা গলাচিপা সদরসহ ডাকুয়া, কলাগাছিয়া, চিকনিকান্দি, গজালিয়া ও বকুলবাড়িয়া ইউনিয়নের মানুষদের উপজেলা সদরে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। এই সড়ক পটুয়াখালী সদর, দশমিনা ও বাউফল উপজেলার সঙ্গেও সংযোগ স্থাপন করে।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
