হাতে পত্রিকা নিয়ে বয়োবৃদ্ধ এক লোক ঘুরে বেড়াচ্ছেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, টিএসসি, আবাসিক হল, প্রশাসনিক ভবনসহ পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের কাছে এটি অতি পরিচিত একটি দৃশ্য। কেননা বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পত্রিকা বিক্রি করে আসছেন আবদুল মান্নান। সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেই দেখা মিলবে তার। বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরুর আগে হাজী মোহাম্মদ দানেশ কৃষি কলেজেও পত্রিকা বিক্রি করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে প্রায় ৪২ বছর ধরে পত্রিকা বিক্রি করছেন ৭০ বছর বয়স্ক আবদুল মান্নান। শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচয় পেপার আংকেল বা পেপার দাদু।প্রতিদিন সকালে দিনাজপুর বাস টার্মিনালের নিজের বাসা থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ পারি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন তিনি। গাড়ি থেকে পত্রিকা নামিয়ে আশেপাশের এলাকায় বিলি করার জন্য তা বুঝিয়ে দেন নিজের কর্মচারীকে। অবশিষ্ট পত্রিকা হাতে নিয়ে তিনি এরপর নিজেই বিলি করে বেড়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে। কখনও অফিস, কখনও টিএসসি, কখনও আবাসিক হলে তিনি ছুটে বেড়ান দুপুর পর্যন্ত। এভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে পত্রিকা বিলি করে আসছেন দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে।কীভাবে এই কাজ তিনি শুরু করেছেন তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথমে দিনাজপুর এসে আমার ভগ্নিপতির বাসায় উঠি। তিনি মাজনের ব্যবসা করতেন। তার থেকে তিনটি মাজন নিয়ে আমি নিজে মাজনের ব্যবসা শুরু করি। এরপর প্রায় এক বছর পরে সৈয়দপুরে গিয়ে মাজন এবং বই বিক্রি শুরু করি গাড়িতে ঘুরে ঘুরে। তখন এক মহাজন বলেন, সাথে কয়েকটা পেপারও রাখতে। এরপর থেকেই পেপার বিক্রি শুরু করি।’ বিশ্ববিদ্যালয়ে কীভাবে পত্রিকা বিক্রি শুরু হয় এ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘তখন সৈয়দপুর থেকে পেপার এনে দিনাজপুর দশমাইলে গাড়িতে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতাম। তখন দিনাজপুরে তিনদিন পরে পেপার আসতো আর সৈয়দপুরে বিমানে করে প্রতিদিন পেপার আসতো। তখন হাজী দানেশ কৃষি কলেজের লাইব্রেরীয়ান আমাকে প্রতিদিন সৈয়দপুর থেকে একটা করে পেপার নিয়ে আসতে বলে। সেই থেকে হাজী দানেশে আমার পেপার বিক্রি শুরু। সেই এক কপি থেকে এখন হাজী দানেশে আমি প্রতিদিন প্রায় ৪০০ কপি পেপার বিলি করি। এই এলাকার সব পেপার আমি বিলি করি, এজন্য আমার কর্মচারী আছে। তবে এখন ছাত্রদের মধ্যে পত্রিকা কেনার অভ্যাস কমে এসেছে বলে জানান তিনি। বলেন, ‘এখনতো মোবাইলেই সব পত্রিকা পড়া যায়। এজন্য ছাত্ররা তেমন একটা পেপার কেনেনা। তবে সরকারি অফিস, বিভিন্ন দপ্তর, আবাসিক হলগুলোতে পেপার বিক্রি হয়।’পত্রিকা বিক্রি করে বাসায় ফেরার সময় ২০১৩ সালের ১৭ মার্চ শিকার হন মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার। নসিমন থেকে পড়ে গিয়ে এক পা প্রায় বিকল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয় তার। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়ে আবার ফেরেন পুরাতন কাজে। বলেন, ‘একদিন পেপার বিক্রি শেষে নসিমনে করে বাসায় ফেরার পথে মারাত্মক এক্সিডেন্ট হয়। সাথে সাথে আমাকে উদ্ধার করে দিনাজপুর মেডিকেলে নিয়ে যায়। ডাক্তার একসময় বলে পা কেটে ফেলতে হবে। তবে ছোট ভাইয়ের আপত্তিতে তা হয়নি। তিন মাস পর সুস্থ হলেও পা আর আগের মতো হয়নি। এখনও এক পা প্রায় বিকল হয়েই আছে। চিকিৎসা করাতে গিয়ে একসময় অর্থনৈতিক দুর্দশাতেও পড়ি। আমার সেবা করতে গিয়ে আমার স্ত্রীও অসুস্থ হয়ে গিয়েছিল একপর্যায়ে।’এতো সংগ্রামের পরেও থেমে থাকেননি আবদুল মান্নান। তার এই সংগ্রামী জীবন থেকে এবং তাকে দেখে নিজেরাও অনুপ্রাণিত হন বলে জানান শিক্ষার্থীরা।আতকিয়া মাইশা নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার সময় থেকেই তাকে আমরা দেখছি। মাঝেমধ্যে প্রয়োজন হলে পত্রিকাও কিনি। তিনি যেভাবে এই বয়সে এসেও পরিশ্রম করেন, এটা অবশ্যই আমাদের কাছে অনুপ্রেরণার মতো কাজ করে।’সৌরভ রাজ নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এতোদিন ধরে ফিজিক্যাল ডিজএবিলিটি নিয়ে যেভাবে তিনি সংগ্রাম করছেন, তা আমাদের কাছে অনুকরণীয়।’জীবনে যতদিন পারবেন এভাবেই ৪২ বছরের পেশাকে আকড়ে ধরে বাকি জীবন কাটাতে চান আবদুল মান্নান।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
