ভারতীয় নার্স নিমিশা প্রিয়া যে ইয়েমেনি নাগরিককে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা পেয়েছেন, সেই তালাল আব্দো মাহদির ভাই বিবিসিকে বলেছেন যে মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কোনো শাস্তিই তারা মানতে রাজি নন।বিবিসি অ্যারাবিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আব্দেলফাতাহ্ মাহদি বলেছেন, মীমাংসার ব্যাপারে আমাদের অবস্থান খুব স্পষ্ট। আল্লাহর তৈরি আইন ‘কিসাস’-ই কার্যকর করতে হবে, অন্য কোনো কিছু নয়।”এখানে কিসাস’ একটা আরবি শব্দ। এর অর্থ প্রতিশোধ বা বদলা নেওয়া।ইসলামি আইন অনুযায়ী, শারীরিক আঘাত সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি দেওয়ার পদ্ধতিই ‘কিসাস’। নারী ও পুরুষ – উভয়ের ক্ষেত্রেই এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।সহজ কথায়, কিসাস হলো প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ নেওয়া। অর্থাৎ একজনকে যতটা আঘাত করা হয়েছে, অপরাধীকেও ঠিক ততটাই আঘাত পেতে হবে।”আব্দেলফাতাহ্ মাহদি বিবিসি অ্যারাবিককে ওই সাক্ষাৎকার দেওয়ার পরে অবশ্য নিমিশা প্রিয়ার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আপাতত স্থগিত করেছে ইয়েমেনের কর্তৃপক্ষ। বুধবার ওই সাজা কার্যকর করার কথা ছিল।এর আগে ক্ষতিপূরণ হিসাবে নিমিশা প্রিয়া’র আত্মীয়স্বজন ও সমর্থকরা মি. মাহদির পরিবারকে ‘ব্লাড মানি’ দিতে বা ১০ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেন এবং পরিবারকে সেটা ‘অফার’ও করা হয়েছে বলে জানা গেছে।কিন্তু মৃতের পরিবার কোনো সমঝোতাতেই রাজি নয় বলে স্পষ্ট জানিয়েছে এবং তারা ক্ষমা না করলে নিমিশা প্রিয়ার প্রাণ কোনোভাবে বাঁচানো সম্ভব নয়।মৃত তালাল আব্দো মাহদি ভারতীয় নার্স নিমিশা প্রিয়ার ব্যবসায়িক অংশীদার ছিলেন। ২০১৭ সালে তালাল আব্দো মাহদির টুকরো টুকরো করা দেহ একটি জলের ট্যাংক থেকে উদ্ধার করা হয়।এরপরই সেই হত্যার অভিযোগে নিমিশা প্রিয়াকে গ্রেফতার হতে হয় এবং সে দেশের আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।এদিকে বিবিসি অ্যারাবিককে আব্দেলফাতাহ্ মাহদি বলেছেন যে তারা পরিবার “শুধু যে একটি নারকীয় অপরাধের শিকার হয়েছে তা নয়, দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েও পরিবারকে যেতে হয়েছে। এটা তো একটা ভয়াবহ এবং জঘন্য অথচ সুস্পষ্ট অপরাধের ঘটনা।”তার কথায়, “ভারতীয় গণমাধ্যমে সত্যের অপলাপ ঘটানোর প্রচেষ্টা চলছে দেখে আমরা ব্যথিত। সাজাপ্রাপ্ত একজনকে পরিস্থিতির শিকার বলে তুলে ধরা হচ্ছে যাতে ওই অপরাধটাকে ন্যায্যতা দেওয়া যায়। আমরা স্পষ্টভাবে বলছি যে এখানে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা হচ্ছে।”“একটা বিবাদ – যে কারণেই হয়ে থাক, যত বড়ই হোক সেই বিতর্ক, তা কোনোভাবেই একটা হত্যাকে ন্যায্যতা দিতে পারে না। এর ওপরে এই ঘটনায় তো দেহটিকে টুকরো করে, বিকৃত করে লুকিয়ে ফেলা হয়েছিল,” জানিয়েছেন আব্দেলফাতাহ্ মাহদি।আব্দেলফাতাহ্ মাহদি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, “মৃত্যুদণ্ড পিছিয়ে যাওয়ায় আমরা হতাশ। আমরা এটা আশা করিনি। আদালত তো জানে যে আমরা কোনো ধরনের সমঝোতা করতে রাজি নই।”“যতক্ষণ না মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে ততক্ষণ আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাব। কোনোরকম চাপের কাছে আমরা নতি স্বীকার করব না। রক্ত নিয়ে ব্যবসা করা যায় না। ন্যায়বিচার পেতে যতই সময় লাগুক আমরা কোনো সমঝোতা করব না,” ফেসবুক পোস্টে বলেছেন তিনি।মধ্যস্থতা এবং আলোচনা নিয়ে মি. মাহদি লিখেছেন, “মধ্যস্থতা আর আলোচনায় কোনো নতুন কিছু নেই। অনেক বছর ধরেই এই ঘটনায় মধ্যস্থতার প্রবল প্রচেষ্টা চলছে। এ সত্ত্বেও আমাদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমাদের দাবি খুব স্পষ্ট। অপরাধীকে সাজা পেতেই হবে। এছাড়া আমরা আর কোনো কিছুই চাই না।” অন্যদিকে, নয়াদিল্লিতে আসীন ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ইতোমধ্যে একাধিকবার বলেছে যে নিমিশা প্রিয়ার ঘটনায় তারা ইয়েমেনের সরকারের সঙ্গে যেমন ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলেছে, তেমনই ওই নার্সের পরিবারের পাশেও তারা সবসময়ে রয়েছে।ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের প্রশাসন ছাড়াও ভারত এই বিষয়ে সৌদি আরব, ইরান এবং ইয়েমেনের আরও কয়েকটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে, যাতে তাদের মাধ্যমে হুথি বিদ্রোহীদের প্রশাসনের ওপরে কিছুটা প্রভাব বিস্তার করা যায়। প্রসঙ্গত, অভিযুক্ত নিমিশা প্রিয়া কেরালার পালাক্কর জেলার বাসিন্দা। নিমিশা নার্সের চাকরি নিয়ে ২০০৮ সালে ইয়েমেনে গিয়েছিলেন। সেখানে যাওয়ার পর স্বামী টমি থমাস এবং মেয়ের সঙ্গেই থাকছিলেন নিমিশা। পরে ২০১৪ সালে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তার স্বামী এবং ১১ বছরের মেয়ে ভারতে ফিরে এলেও নিমিশা সেখানেই থেকে যান। তার ইচ্ছা ছিল, ইয়েমেনে নিজের ক্লিনিক খুলবেন।২০১৪ সালে ইয়েমেনি নাগরিক তালাল আব্দো মাহদির সঙ্গে যোগাযোগ হয় তার। মাহদি তাকে নতুন ক্লিনিক খুলতে সাহায্য করবেন বলে আশ্বাস দেন। কারণ আইন অনুযায়ী, ইয়েমেনে নতুন ব্যবসা শুরু করতে গেলে দেশীয় অংশীদার রাখা বাধ্যতামূলক। সেই মতো ২০১৫ সালে দু’জন মিলে নতুন ক্লিনিক খোলেন; কিন্তু এর পর থেকেই শুরু হয় দুই অংশীদারের মতবিরোধ।অভিযোগ, নিমিশার অর্থ এবং পাসপোর্ট মাহদি কেড়ে নিয়েছিলেন মাহদি। মারধর করে নিমিশাকে মাদকসেবনেও বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে মাহদির বিরুদ্ধে। আইনি কাগজপত্রে নিমিশাকে স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দিয়ে প্রশাসনিক সাহায্য পাওয়ার পথও প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পুলিশের দ্বারস্থ হয়েও লাভ হয়নি।এই পরিস্থিতিতে ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই মাহদিকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দেন ওই নার্স। নিমিশার দাবি, মাহদিকে ঘুম পাড়িয়ে নিজের পাসপোর্ট পুনরুদ্ধার করাই ছিল তার উদ্দেশ্য। কিন্তু ওভারডোজ়ের কারণে মৃত্যু হয় মাহদির। এর পর হানান নামে এক সহকর্মীর সঙ্গে মিলে মাহদির দেহ টুকরো টুকরো করে কেটে পানির ট্যাঙ্কে ফেলে দেন ওই নার্স। ওই মাসেই ইয়েমেন ছেড়ে পালানোর সময় ধরা পড়ে যান নিমিশা। সেই থেকে ইয়েমেনের জেলেই বন্দি রয়েছেন এই ভারতীয় নারী।এবি
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
