চট্টগ্রাম নগরের চকবাজারের গুলজার মোড়–শিক্ষাপাড়া খ্যাত এই এলাকায় প্রতিদিন ভিড় জমে হাজারো শিক্ষার্থীর। মেডিকেল ভর্তি, বিসিএস প্রস্তুতি কিংবা মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার জন্য তারা ছুটে আসে নামীদামী কোচিং সেন্টারে। মোড়ের পাশেই অবস্থিত গুলজার টাওয়ার। ভবনটিতে চলছে ১৬টি কোচিং প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর মধ্যে ৭টি প্রতিষ্ঠান একেবারেই নিবন্ধন ও ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াই অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে।এ চিত্র কেবল গুলজার টাওয়ারেই সীমাবদ্ধ নয়। নগরের প্রায় সব এলাকাতেই চলছে একই চিত্র। সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) অনুমোদন ও নিবন্ধন ছাড়া অবাধে পরিচালিত হচ্ছে শত শত কোচিং সেন্টার। ফলে একদিকে সরকার হারাচ্ছে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব, অন্যদিকে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম থাকছে তদারকির বাইরে। নগরবাসীর প্রশ্ন–আইন অমান্য করে কার ছত্রছায়ায় চলছে এই বাণিজ্য?চসিকের রাজস্ব বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নগরে বর্তমানে ২৩৪টি কোচিং সেন্টার চিহ্নিত রয়েছে। এর মধ্যে ১৬২টি (৬৯ শতাংশ) কোনো নিবন্ধন বা ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াই কার্যক্রম চালাচ্ছে। আর ৭২টি কোচিং সেন্টারের লাইসেন্স থাকলেও তার অর্ধেকের বেশি (৪৯টি) সময়মতো নবায়ন করেনি। ফলে নিয়ম মেনে বৈধভাবে চলছে মাত্র ২৩টি কোচিং সেন্টার।স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন-২০০৯ এর ১১১ ধারা অনুযায়ী, সিটি কর্পোরেশন এলাকায় নিবন্ধন ছাড়া কোনো কোচিং সেন্টার চালু করা আইনত নিষিদ্ধ। নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে মেয়রের কাছে আবেদন করতে হয়। এরপর তদন্তে সন্তুষ্ট হলে লাইসেন্স অনুমোদন দেওয়া হয়। চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল সময়ের কন্ঠস্বর-কে বলেন, ‘ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া কোনো কোচিং সেন্টারের কার্যক্রম সম্পূর্ণ অবৈধ। এ ক্ষেত্রে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং লাইসেন্স না করা পর্যন্ত প্রতিদিন ৫০০ টাকা করে অতিরিক্ত জরিমানা আরোপের বিধান রয়েছে।’রাজস্ব সার্কেল-৬ (পাহাড়তলী, হালিশহর) এলাকার ৪৬টির মধ্যে ৪৫টিরই লাইসেন্স নেই। রাজস্ব সার্কেল-৮ (বন্দর, পতেঙ্গা, ইপিজেড) এলাকার ৪৫টির মধ্যে বৈধ মাত্র ৩, বাকি সব অবৈধ। রাজস্ব সার্কেল-৭ (আগ্রাবাদ) এলাকার ৩৮টির মধ্যে ৩২টির ট্রেড লাইসেন্স নেই। রাজস্ব সার্কেল-২ (চকবাজার) এলাকার ৭৫টির মধ্যে বৈধ মাত্র ১৪টি, বাকিগুলো অবৈধ। রাজস্ব সার্কেল-১ (ষোলশহর, শুলকবহর, পাঁচলাইশ) এলাকার ১১টির মধ্যে বৈধ আছে মাত্র ১টি। রাজস্ব সার্কেল-৫ (জামালখান, লালখান বাজার, জিইসি) এলাকার ১৯টির মধ্যে ৩টির লাইসেন্স নবায়ন আছে, বাকি ১৬টি অবৈধ।পরিসংখ্যান বলছে, নগরজুড়ে কোচিং বাণিজ্যের সিংহভাগই চলছে অবৈধভাবে।চসিকের নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কোচিং সেন্টারকে ট্রেড লাইসেন্স ফি, নবায়ন ফি, সাইনবোর্ড করসহ নানা খাতে টাকা জমা দিতে হয়। কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এসব ফি জমা না দেওয়ায় নগর কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। একইসঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাটও ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। অথচ কয়েক লাখ শিক্ষার্থী প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের ফি দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে।অবৈধভাবে কার্যক্রম চালানোর পাশাপাশি, অনুমতি ছাড়াই নগরজুড়ে প্রচারণামূলক ব্যানার-পোস্টার টাঙিয়ে নগরের সৌন্দর্যহানি করছে এসব প্রতিষ্ঠান। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যানার বা সাইনবোর্ডের জন্য এক থেকে দুই হাজার টাকা কর পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু চসিকের তথ্যে দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এ নিয়ম মানছে না। ফলে দেয়ালজুড়ে পোস্টার, রাস্তার পাশে ঝোলানো ব্যানার, ছড়ানো হ্যান্ডবিল–সব মিলিয়ে নগরের পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্য প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।আইন স্পষ্ট হলেও বাস্তবে কেন শত শত অবৈধ কোচিং সেন্টার দাপটের সঙ্গে ব্যবসা চালাচ্ছে, এ প্রশ্ন এখন সচেতন নগরবাসীর মুখে মুখে। সংশ্লিষ্টদের মতে, চসিক ও এনবিআরের নিয়মিত তদারকি জোরদার করা হলে এ খাত থেকে সহজেই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহ সম্ভব।এসআর
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
