মোংলার বিভিন্ন স্থান মাদকের অভায়শ্রমে পরিণত হচ্ছে। সহজলভ্য হওয়ায় জমজমাট হয়ে উঠছে ব্যবসা। ফলে বেড়ে যাচ্ছে ক্রেতা। এই ক্রেতাদের সিংহভাগই কিশোর। ইয়াবা কিছুটা অগোচরে হলেও গাঁজা সেবন ও বিক্রি হয় প্রকাশ্যে। এ যেন মাদকের হাট। দেদারসে চলছে বেচা-কেনা। সব মিলিয়ে ব্যবসা জমজমাট। পুলিশ-প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।রাতারাতি লাখপতি হচ্ছে অনেকে। সরেজমিন ও নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, উপজেলা শতাধিক পয়েন্টে প্রকাশ্যে চলে মাদক সেবন ও বিক্রি। যার মধ্যে পৌর শহরের কবরস্থান রোড, শ্রমিক আবাসিক এলাকা, বন্দরের পরিত্যক্ত ভবন, নতুন কলোনী সংলগ্ন তিন তলা ভবন, বালুর মাঠ, ছাড়াবাড়ি হেলথ, মেরিন ড্রাইভ রোড, ১নং জেটি সংলগ্ন টিন শেড, তাহেরের মোড়, মাদ্রাসা রোড, শামসুর রহমান রোড, কুমারখালি, মাছমারা, নারিকেল তলা আবাসন এলাকা, রাজ্জাক সড়ক, বটতলা, কানাইনগর ক্যাফের পাশে ফাঁকা বিলে, সিগনাল টাওয়ার এলাকা, কানাইনগর, মনপুরা বিজ্র সংলগ্ন, চৌকিদারের মোড়, মোংলা পৌর শহরের নতুন বাসস্ট্যান্ড, জয় বাংলা সড়ক, শাহজালাল পাড়া, মিয়া পাড়া, পৌর সভার পানির প্রকল্প এলাকা সংলগ্ন পুকুর পাড়, কবরস্থান পুকুর পাড়, শ্রমিক সংঘের মাঠ সংলগ্ন কৃষ্ণচুরা গাছ তলা, পিকনিক কর্নার, দিগরাজ বালুর মাঠ, দিগরাজ বাস স্ট্যান্ড হটস্পট হিসেবে পরিচিত। এসব স্পটে হরহামেশায় চলে গাঁজা ও ইয়াবা সেবন ও বিক্রি।বিভিন্ন স্থান থেকে মোংলায় মাদকের চালান আসে। মোংলা বাসস্ট্যান্ড, লাউডোব খেয়া ঘাট, বাজুয়া খেয়া ঘাট, জিউধারা, বৌদ্বমারি, বানিশান্তা ঘাট, রামপালের পেড়িখালি, বুড়িরডাঙ্গা ও পাকখালির খেয়া পারাপার এলাকা থেকে মাদকের চালান প্রথমে চলে যায় কারবারিদের হাতে। দ্বিতীয় ধাপে চলে যায় মাদক সেবনকারীদের হাতে। বিভিন্ন কলাকৌশলে চলে মাদকের খুচরা বিক্রি। মোবাইল কল, হোম ডেলিভারি ও হাতে হাতে হয় কেনা-বেচা।নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক মাদক সেবী জানায়, প্রতি গাঁজার পোটলা বিক্রি হয় ২০০ টাকা ও প্রতি পিস ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রি হয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে। চাহিদা বেশি উঠতি বয়সী তরুণ ও যুবকদের।মাদক প্রতিরোধে পুলিশ-প্রশাসনের উদ্যোগে মাঝে মাঝে মাদক বিরোধী সভা-সমাবেশ করলেও এতে হচ্ছে না কোন লাভ। আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় মাদক প্রতিরোধ নিয়ে সবাই ভাল কথা বলে দায় এড়িয়ে যায়। তবে বাস্তবে এর কোন ফল পাওয়া যায় না। মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন উদ্যোগ নিলেও কোন কাজ হচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে মাদকের বিস্তার কমানো যাবে না।গাঁজা, বাংলা মদ, হুইস্কি ও বিআরের পাশাপাশি হরদমে চলছে মরণ নেশা ইয়াবা। যা প্রকাশ্যে বিক্রি করছে ব্যবসায়ীরা। আর এ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য ও উঠতি বয়সী তরুণরা। তাই স্থানীয়রা কেউ ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন না।নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, একজন মাদক ব্যবসায়ী আটক করা হলে অনেকে তদবির শুরু করে। পুলিশ-প্রশাসনের বিরুদ্ধে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করা হয়। তো কিভাবে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই করবে পুলিশ?নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, মাদকের ভয়ানক থাবায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমাদের অল্প বয়সী ছেলেরা। ধ্বংস হচ্ছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরাও। তাদের মতে নতুন নতুন মাদক ব্যবসায়ী হওয়ার কারণে বাড়ছে মাদক সেবনকারীর সংখ্যাও, সাথে মোবাইল জুয়া তো রয়েছে।এসব মাদক ব্যবসায়ীরা মাদক তুলে দিচ্ছে উঠতি বয়সী যুবকদের হাতে। যার মধ্যে বেশিভাগ স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা। মা-বাবার চোখের সামনে মাদকাসক্ত হচ্ছে যুবক ছেলে। এ কষ্ট কিভাবে মেনে নিবে অভিভাবকরা। তাই মাদকাসক্ত সন্তানদের চরম দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে অভিভাবকরা। যুব সমাজকে রক্ষা করতে হলে এসব মাদক ব্যবসায়ীদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে বলে দাবি করেন তারা।সম্প্রতি পৌর শহরের রাজ্জাক সড়কের মাদক ব্যবসায়ী তিশার বিরুদ্ধে মাদক নিয়ে লেখালেখির কারণে মোংলার স্থানীয় সাংবাদিক মাসুদ রানা (রেজা মাসুদ) কে মোবাইলে হুমকি দেয়া হয়, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অডিও রেকর্ডটি মোংলার উপজেলা জুড়ে আলোচনার ঝড় তোলে।এ বিষয়ে তিনি মোংলা থানার ওসিকে মৌখিকভাবে জানান। এছাড়া মাদক ব্যবসায়ীরা হেয় করতে তার বিরুদ্ধে তার ছবি ও নাম ব্যবহার করে ফেসবুকে ফেইক আইডি খুলে তার সুনাম ক্ষুণ্ন করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। এ বিষয়ে মোংলা থানায় সাধারণ ডায়রি করেছেন বলে জানান সাংবাদিক রেজা মাসুদ।অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাদক ব্যবসা করে ভাগ্য খুলে গেছে অনেকের। দিন দিন বাড়ছে অর্থ-সম্পদ। অভিযোগ রয়েছে, এসব মাদক সম্রাটদের মদদ দিচ্ছেন বিভিন্ন দলের কিছু নেতারা।এদিকে পুলিশ নামে মাত্র মাদক বিরোধী অভিযান পরিচালনা করলেও রাঘববোয়ালেরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। সচেতন নাগরিকেরা বলেছেন, মাদক মুক্ত সমাজ গড়তে সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই। এগিয়ে আসতে হবে জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের।উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার সুমী বলেন, বর্তমান যুব সমাজকে মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে দূরে রাখতে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এ বিষয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার জন্য বলা হয়েছে। আমরা মাদক নির্মূলে দ্রুত মোংলা থানার ওসিকে অবহিত করে সাঁড়াশি অভিযান চালানোর চেষ্টা করবো।এছাড়াও মোংলা উপজেলাকে মাদকমুক্ত করতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বাগেরহাট, মোংলা থানা পুলিশ, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হবে বলেও জানান তিনি।মোংলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আনিসুর রহমান বলেন, নিয়মিত মাদক বিরোধী অভিযান চলছে। মাদকের সাথে পুলিশের কোন আপোষ নেই। খোঁজ পেলেই এসব মাদক ব্যবসায়ীদের ধরা হচ্ছে/হবে। মাদকের ব্যাপারে মোংলা থানা পুলিশ কঠোরভাবে মাঠে কাজ করছে। যে কোন মাদক ব্যবসায়ীকে পাওয়া মাত্রই আটক করা হবে।এআই
Source: সময়ের কন্ঠস্বর
